নেত্রকোণা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এক অপরূপ জেলা, যার প্রাকৃতিক ভিন্নতা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ইতিহাস একে করেছে অনন্য। সবুজে ঘেরা পাহাড়, নদী ও হাওরের অসীম জলরাশি মিলে এ এক প্রাকৃতিক লীলাভূমি। গারো পাহাড়ের পাদদেশে কংস, সোমেশ্বরী ও মগড়ার স্রোতে ধুয়ে যাওয়া এই জনপদে রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। এই জেলায় রয়েছে ১০টি উপজেলা, ৫টি পৌরসভা, ৮৬টি ইউনিয়ন এবং ২,২৮২টি গ্রাম।
২৭৯৪বর্গ কি.মি. আয়তন
২৩ লাখ+জনসংখ্যা (২০২২)
১০টিউপজেলা
৮৬টিইউনিয়ন
ইতিহাসে নেত্রকোণা
ইতিহাসে নেত্রকোণা
খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত নেত্রকোণার ইতিহাস সমৃদ্ধ বহু অধ্যায়ে।
গুপ্ত সম্রাটদের অধীনে এই অঞ্চল কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।
১২৮০ খ্রি.
সোমেশ্বর পাঠক 'সু-সঙ্গ' রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন — যা আজ সুসং দুর্গাপুর নামে পরিচিত।
১৪৯৩–১৫১৯
আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে সমগ্র ময়মনসিংহ মুসলিম রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৮১৫–১৮৩৮
পাগলপন্থী বিদ্রোহ — টিপু পাগলার নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। ইংরেজরা নাটেরকোণায় প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করে।
১৮৮০–১৮৮২
নেত্রকোণা মহকুমা মঞ্জুর। ১৮৮২ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে মহকুমার কার্য শুরু।
১৯৭১
মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা ১১ নং সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত। ৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ বরণ করেন। ৯ ডিসেম্বর নেত্রকোণা হানাদারমুক্ত হয়।
১৭ জানুয়ারি ১৯৮৪
নেত্রকোণা আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা হিসেবে ঘোষিত হয়।
পর্যটন
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নেত্রকোণা
নেত্রকোণা প্রকৃতির অপার দানে সমৃদ্ধ। চীনামাটির পাহাড়, ঐতিহাসিক দুর্গ, বিস্তৃত হাওর আর সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ জল এই জেলা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।
এই জনপদের বাতাসে মিশে আছে জালাল, রশিদ উদ্দিন ও উকিল মুন্সির গান। এখানেই জন্মেছেন অগণিত বীর, শিক্ষাবিদ, কবি-লেখক — যাঁরা নিজেদের কর্মে নেত্রকোণাকে করেছেন গর্বিত।
লেখক, চলচ্চিত্র পরিচালক, নাট্যকার। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক।
নির্মলেন্দু গুণ
১৯৪৫ — বর্তমান
কবি ও সাংবাদিক। বাংলাদেশের প্রধান কবিদের অন্যতম।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
১৯৫২ — বর্তমান
লেখক ও অধ্যাপক। বিজ্ঞান ও কল্পকাহিনির লেখক।
হেলাল হাফিজ
১৯৪৮ — ২০২৪
কবি ও সাংবাদিক। "যে জলে আগুন জ্বলে" বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা।
শিল্প সাহিত্যে
শিল্প সাহিত্যে নেত্রকোণা
নেত্রকোণার মানুষের জীবনধারায় মিশে আছে হাজার বছরের কৃষ্টি। পালাগান, বাউল সংগীত, ষাঁড়ের লড়াই, গ্রামীণ মেলা, লোকসংগীত — এমনি নানা উপকরণে সজ্জিত এখানকার ঐতিহ্য।
উকিল মুন্সি, রশিদ উদ্দিন ও জালালের সুর এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছে। বাউল ও পালাগান নেত্রকোণার আত্মার সুর।
সাহিত্য ও কবিতা
সাহিত্য
হুমায়ূন আহমেদ থেকে নির্মলেন্দু গুণ — নেত্রকোণার সন্তানরা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন অমূল্য সব রচনা।
গ্রামীণ মেলা ও উৎসব
ঐতিহ্য
বৈশাখী মেলা, ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচ — এই উৎসবগুলো নেত্রকোণার সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মৈমনসিংহ গীতিকা
লোকসাহিত্য
মহুয়া, মলুয়া, দেওয়ান ভাবনার মতো পালাগুলো এই অঞ্চলের লোকজ সাহিত্যের গর্বিত নিদর্শন।
ধর্মীয় সম্প্রীতি
সংস্কৃতি
হিন্দু, মুসলিম, গারো — ভিন্ন ধর্মে ভিন্ন জাতিতে মিলেমিশে নেত্রকোণার সমাজ হয়েছে সমৃদ্ধ।
লোকশিল্প ও হস্তশিল্প
কারুশিল্প
গারো তাঁতবস্ত্র, বাঁশ-বেতের কাজ ও মাটির পাত্র — এই অঞ্চলের লোকশিল্পের ঐতিহ্য শতবর্ষের।
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য
জিআই স্বীকৃত নেত্রকোণার পণ্য
নেত্রকোণা এখন পর্যন্ত দুটি জিআই (GI) স্বীকৃতি অর্জন করেছে — ২০২১ সালে বিজয়পুরের সাদামাটি এবং ২০২৫ সালে বালিশ মিষ্টি। এই স্বীকৃতি নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক পরিচয়কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছে।
প্রায় ১১০ বছর আগে বারহাট্টা রোডে গয়ানাথ ঘোষ প্রথম এ মিষ্টি তৈরি করেন। দুধের ছানা, চিনি ও ময়দা মিশিয়ে বড় আকারের মিষ্টি — কোলবালিশের মতো দেখতে হওয়ায় সমাজসেবক আব্দুস সালাম পেয়ার মিয়া এর নাম দেন 'বালিশ মিষ্টি'।
দেশ স্বাধীনের আগেই গয়ানাথ ভারতে চলে গেলে শিষ্য নিখিল চন্দ্র মোদক এই ঐতিহ্য ধরে রাখেন। বর্তমানে তাঁর তিন ছেলে — বাবুল, দিলীপ ও খোকন চন্দ্র মোদক — গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে এই ঐতিহ্য বহন করছেন।
~১৯১৫
প্রথম তৈরি
১১০+
বছরের ঐতিহ্য
২০২৫
জিআই স্বীকৃতি
বাংলাদেশের জিআই পণ্য
২০২১
চিনামাটি (কেওলিন) · দুর্গাপুর
বিজয়পুরের সাদামাটি
দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুরে অবস্থিত সাদা চিনামাটির পাহাড় ২০২১ সালে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। নীল আকাশের নিচে সাদা পাহাড় — দৃশ্যটি অপার্থিব।
এই চিনামাটি (কেওলিন) বাংলাদেশের সিরামিক ও কাচ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি নেত্রকোণার প্রথম জিআই স্বীকৃত পণ্য।
২০২১
জিআই স্বীকৃতি
১ম
নেত্রকোণার জিআই
দুর্গাপুর
উপজেলা
জিআই (GI) পণ্য কী? ভৌগোলিক নির্দেশক (Geographical Indication) পণ্য হলো এমন পণ্য যা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় উৎপাদিত এবং সেই এলাকার নামেই পরিচিত। এই স্বীকৃতি পণ্যের মান ও ঐতিহ্য রক্ষায় আইনি সুরক্ষা দেয়।
নদীমাতৃক জেলা
নদীর বাঁকে নেত্রকোণা
এই জেলায় ৪৪টি নদী রয়েছে। গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা স্রোতধারা এই জেলার জীবন ও সভ্যতাকে গড়ে তুলেছে। প্রতিটি নদী এখানে শুধু জলের ধারা নয় — এক একটি জীবনের গল্প।
মেঘালয়ের গারো পাহাড় থেকে উৎপন্ন। দুর্গাপুর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ। দৈর্ঘ্য ৫০ কি.মি., প্রস্থ ১১৪ মি.। এই নদীতেই পাওয়া যেত বিরল মহাশোল মাছ — যা এখন প্রায় বিলুপ্ত।
মগড়া নদী
নেত্রকোণার দীর্ঘতম নদী — ১১২ কি.মি.। ব্রহ্মপুত্র থেকে উৎপন্ন, ত্রিমোহনী হয়ে মগড়া নাম পায়। নেত্রকোণা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যায়। ৪০০ বর্গমাইল এলাকায় প্রবাহিত।
পাহাড় ও উপজাতি
পাহাড় পাহাড়ি
নেত্রকোণার উত্তরে গারো পাহাড়ের পাদদেশে বাস করে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। গারো, হাজং, সাঁওতাল — তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারা এই জেলাকে করেছে বৈচিত্র্যময়।
গারো, সাঁওতাল, হাজং সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বাস। মোট পরিবার ৬,০৬৯টি, জনসংখ্যা ২৫,২৪৭ জন (২০২২ আদম শুমারি)। বিরিশিরিতে রয়েছে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি।
বিজয়পুরের চিনামাটি
দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুরের সাদা চিনামাটির পাহাড় ২০২১ সালে জিআই (GI) স্বীকৃতি পেয়েছে। এই চিনামাটি (কেওলিন) বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিরিশিরি
দুর্গাপুর উপজেলা
বিজয়পুর চিনামাটি পাহাড়
দুর্গাপুর উপজেলা
রানী খং মিশন
দুর্গাপুর উপজেলা
হাওর জীবন
হাওরের হাওয়া
নেত্রকোণার দক্ষিণ-পূর্বাংশ জুড়ে বিস্তৃত হাওর অঞ্চল। বর্ষায় এই হাওরগুলো যেন অন্তহীন সমুদ্র — শীতে সবুজ ফসলের বিশাল মাঠ। হাওরের মানুষের জীবন প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার।
নেত্রকোণার 'বালিশ মিষ্টি' এখন বাংলাদেশের ৫৮তম জিআই পণ্য। প্রায় ১১০ বছর আগে বারহাট্টা রোডে গয়ানাথ ঘোষ প্রথম এ মিষ্টি তৈরি করেন। কোলবালিশের মতো দেখতে হওয়ায় সমাজসেবক আব্দুস সালাম পেয়ার মিয়া এর নাম দেন 'বালিশ মিষ্টি'। এর আগে ২০২১ সালে বিজয়পুরের চিনামাটি প্রথম জিআই স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে গয়ানাথের শিষ্য নিখিল মোদকের তিন ছেলে এই ঐতিহ্য বহন করছেন।
জিআই পণ্য
বালিশ মিষ্টি
ছানা, চিনি ও ময়দায় তৈরি বিশাল আকারের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি
চ্যাপা শুটকি
হাওরের পুঁটি মাছে তৈরি বিশেষ পদ্ধতির শুটকি
দামড়া পিঠা
শীতের ঐতিহ্যবাহী পিঠা, বিশেষ উপলক্ষে তৈরি হয়
কবাক
গারো পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী খাবার
প্রশাসনিক বিভাগ
নেত্রকোণার দশ উপজেলা
নেত্রকোণা জেলা ১০টি উপজেলা, ৫টি পৌরসভা, ৮৬টি ইউনিয়ন এবং ২,২৮২টি গ্রাম নিয়ে গঠিত। প্রতিটি উপজেলার আলাদা ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও মানুষ।