তিনি একজন বিশিষ্ট সংস্কৃতিমনা কবিয়াল এবং আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন। নেত্রকোনা ও কেন্দুয়া অঞ্চলে কবিয়াল হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন এবং শাস্ত্রীয় ধারায় সংগীত চর্চায় অবদান রাখেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর অত্যাচারে দেশত্যাগ করে শরণার্থী অবস্থায় মেঘালয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে অসংখ্য ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজ হলো 'মোদের গরব', 'বিজয়োল্লাস' এবং 'ফিরে দেখা একাত্তর'।
তিনি নেত্রকোনা অঞ্চলের বিশিষ্ট ভাষা সৈনিক ছিলেন এবং ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন। রাজনৈতিক জীবনে মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের সদস্য হিসেবে জনহিতকর কাজ এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন গারো বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১১ নং সেক্টরের অধীনে বিজয়পুর ও কলমাকান্দা অঞ্চলে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের আগে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহকারী এই যোদ্ধা স্বাধীনতার পরেও অতি সাধারণ শ্রমজীবী হিসেবে জীবনযাপন করে দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তিনি একজন বিশিষ্ট কবি এবং পেশায় শিক্ষক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'মাতালের রাত্রি যাপন' ও 'দুপুর ও ছায়ার জ্যামিতি' অন্যতম। তিনি 'একা' নামক কবিতার ছোটকাগজ সম্পাদনা করেন। তাঁর লেখনীতে নেত্রকোণা অঞ্চলের জীবন ও প্রকৃতির নিবিড় প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়, যা আধুনিক বাংলা সাহিত্যে অত্যন্ত সমাদৃত।
তিনি একজন বিশিষ্ট সংগীত শিক্ষক এবং ময়মনসিংহ সংগীত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। কলকাতা থেকে রাগসংগীত ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে শিক্ষা লাভ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে কাব্যসংগীত প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অসংখ্য সংগীতশিল্পীকে তালিম দিয়ে তিনি এই অঞ্চলে একটি সুস্থ সংগীতধারা প্রবর্তন করেন।
তিনি নেত্রকোণার একজন বিশিষ্ট অভিনেতা ও চিকিৎসক। ছাত্রজীবন থেকেই নাট্যচর্চায় জড়িত থেকে 'মানুষ' ও 'জীবন নদীর তীরে' সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন এবং উদীচীর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের মাধ্যমে জেলার নাট্যচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তিনি বারহাট্টার যাত্রা জগতের এক কিংবদন্তি অভিনেতা ও নির্দেশক ছিলেন। প্রতি বছর দুর্গাপূজায় যাত্রাপালা মঞ্চায়নের মাধ্যমে তিনি এই শিল্পকে লোকসমাজে জনপ্রিয় করে তোলেন। নাটকের ভাষা ও উচ্চারণে তাঁর অনন্য দক্ষতা ছিল এবং তাঁর বসতবাড়িটি কালক্রমে যাত্রাশিল্পীদের এক তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল।
অভয় নাথ বা অভয় চন্দ্র পন্ডিত ছিলেন একজন খ্যাতিমান কবিয়াল। তিনি নিজস্ব কবিগানের দল গঠন করে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টকে গানের উপজীব্য করে বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবেশন করতেন। বেহালা ও হারমোনিয়াম বাজিয়ে তিনি পাকিস্তান আমলের প্রতিকূল পরিবেশেও লোকসংগীতের এই ধারাকে সচল রেখেছিলেন।
তিনি নেত্রকোনার একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইনজীবী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ ছিলেন। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেন এবং দীর্ঘকাল নেত্রকোনা মহকুমা কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। নেত্রকোনা পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সমাজসেবা ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
তিনি নেত্রকোনা অঞ্চলের প্রথম যাত্রাদল 'নিউ গণেশ অপেরা' গঠনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে এই দলটি সারা বাংলাদেশে যাত্রা প্রদর্শন করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। তিনি এই অঞ্চলে যাত্রাশিল্পের প্রসারে এবং লোক-সংস্কৃতির বিকাশে বিংশ শতাব্দীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিযুগের বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী আদর্শের অনুসারী ছিলেন। অনুশীলন দলের সদস্য হিসেবে দীর্ঘ ২০ বছর কারাবরণ করেন। ১৯৪০ সালে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল (আরএসপি) প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালন করেন এবং মার্কসীয় রাজনীতি বিষয়ে বহু তাত্ত্বিক প্রবন্ধ রচনা করে রাজনৈতিক দর্শনে অবদান রাখেন।
তিনি ১১ নং সেক্টরের সহকারী প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দুর্গাপুর ও বিজয়পুর অঞ্চলে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো সম্মুখ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। স্বাধীনতার পর তিনি শিক্ষা জীবনে ফিরে আসেন এবং পরবর্তীকালে জীবিকা নির্বাহের জন্য যান্ত্রিক মেরামতকারী বা মেকানিক হিসেবে কাজ করে জীবন অতিবাহিত করছেন।
তিনি একজন প্রথিতযশা প্রাবন্ধিক এবং পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা ছিলেন। সুদীর্ঘ ৪২ বছর সান্দিকোণা হাইস্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি তিনি সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মানোন্নয়নে অবদান রাখেন।
তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাধক ও সমাজসংস্কারক। 'ভারত সমাজ' পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি ভারত ব্রহ্মচারীর বাণী ও আদর্শ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে লোকশিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাগুলো এই অঞ্চলে বিশেষ অবদান রেখেছিল।
তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীর বিপ্লবী ছিলেন এবং অনুশীলন সমিতির সাথে যুক্ত হয়ে একাধিকবার কারাবরণ করেন। তিনি মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সেবা করেন এবং ভারত সরকার কর্তৃক স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তাম্রপত্র পান।
তিনি বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পের এক কিংবদন্তি 'বিবেক' গায়ক ছিলেন। সুদীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় বিভিন্ন নামী অপেরা দলে বিবেক চরিত্রে অভিনয় ও দরাজ কণ্ঠে গান গেয়ে দেশব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৭৯ সালে জাতীয় যাত্রা উৎসবে তাঁর অসামান্য পরিবেশনা এই শিল্পে তাঁকে উচ্চ আসনে বসায়।
অশ্বিনী সাহা ছিলেন নেত্রকোনা অঞ্চলের একজন বিখ্যাত যাত্রাভিনেতা। কর্মজীবনের শুরুতে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন চারিত্রিক অভিনয়ের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পান। দীর্ঘকাল যাত্রাশিল্পের সাথে যুক্ত থেকে তিনি এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং তাঁর অসামান্য অভিনয় প্রতিভা সাধারণ দর্শকদের বিমোহিত করত।
তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং ১১ নং সেক্টরের বাউল কোম্পানিতে যুদ্ধ করেন। দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা অঞ্চলের বিভিন্ন অভিযানে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর সাহসিকতা নেত্রকোণা অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গৌরবময় যুদ্ধের ইতিহাসের অংশ।
তিনি একজন প্রতিভাবান অভিনেতা এবং নাট্যরূপকার ছিলেন। ময়মনসিংহ গীতিকার বিভিন্ন পালার নাট্যরূপ দিয়ে তিনি তা মঞ্চে সফলভাবে উপস্থাপন করেন। নেত্রকোনা শিল্পকলা একাডেমির সাথে যুক্ত থেকে তিনি 'ফাগুনের আগুন' ও 'মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনা' নাটক রচনার মাধ্যমে স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ১৯৭১ সালে ছাত্রাবস্থায় স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন। ১১ নং সেক্টরের অধীনে বিজয়পুর ও কলমাকান্দা অঞ্চলে অনেকগুলো সফল অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের পরে তিনি কৃষিকাজে আত্মনিয়োগ করেন। নেত্রকোণা অঞ্চলের পাহাড়ি জনপদে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দিতে তাঁর মতো যোদ্ধাদের অবদান অনস্বীকার্য এবং চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ লেখক ও গবেষক। পেশায় শিক্ষক হয়েও তিনি ছড়া, কবিতা ও প্রবন্ধ রচনার মাধ্যমে সাহিত্যচর্চায় অবদান রাখেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'পতাকার ইতিবৃত্ত' এবং 'বাঙালী মুসলমানের পদবী'। তিনি লোকসংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণামূলক পাণ্ডুলিপি প্রণয়নে দীর্ঘদিন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একজন বিশিষ্ট প্রযোজক ছিলেন। তিনি 'তিতাস একটি নদীর নাম' ও 'পদ্মা নদীর মাঝি'সহ মোট ৪২টি চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত ছিলেন। চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আন্তর্জাতিক উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
তিনি একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা এবং আইন বিষয়ক গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনকারী এই ব্যক্তিত্বের হিন্দু আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক বইসমূহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃত। তিনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় এবং নেত্রকোণা জেলার একজন কৃতি সন্তান হিসেবে আইনি গবেষণায় ও জনসেবায় বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদের সদস্য হিসেবে সংবিধান রচনায় স্বাক্ষর করেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ভারতের মহেশখোলা ইয়ুথ ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন।
তিনি নেত্রকোনা অঞ্চলের প্রখ্যাত পীর এবং মালেজোড়া বাউল গানসহ লোকসংগীতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর বাসগৃহটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তিনি নিজে সুগায়ক ছিলেন এবং বাউল দর্শনের বিভিন্ন তত্ত্বের ভিত্তি নির্মাণে নেত্রকোনার বাউলদের পথপ্রদর্শক হিসেবে অসামান্য কাজ করেছেন।
তিনি একজন নাট্য সংগঠক ও জারিগান শিল্পী ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই অভিনয় ও কবিগান রচনার মাধ্যমে বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরেন। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র নেতৃত্ব দেন এবং বারহাট্টায় যাত্রাপালা মঞ্চায়নের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও স্থানীয় রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
তিনি নক্সবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া তরিকার একজন প্রভাবশালী পীর ছিলেন। নিজ খানকায় লঙ্গরখানা খুলে গরিব-দুঃখীদের সেবা করার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি নিজস্ব ঘরানার অনেক আধ্যাত্মিক গান এবং 'বেলায়েত-হিতৈষী' নামক গ্রন্থ রচনা করে এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অবদান রাখেন।
তিনি একজন নির্ভীক সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং মানবাধিকার সংগঠন 'সেন্টার ফর হিউম্যান'-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা সোচ্চার কলম সৈনিক ছিলেন।
তিনি সমসাময়িক সময়ের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় বাউল শিল্পী এবং কালজয়ী গানের স্রষ্টা ছিলেন। সহস্রাধিক গান রচনা করে তিনি 'বাউলা গীতি' গ্রন্থ প্রকাশ করেন। মালেজোড়া বাউল গানে পারদর্শী এই সাধক বেতার ও টেলিভিশনে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করে নেত্রকোনার সমৃদ্ধ বাউল ঐতিহ্যকে দেশব্যাপী পরিচিত করেন।
আজিজুল ইসলাম খান নেত্রকোণার একজন প্রখ্যাত বামপন্থী রাজনীতিবিদ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের দক্ষ সংগঠক ছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে গণতন্ত্রী পার্টির শীর্ষপদে থেকে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।
তিনি ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও লোকসংগীতের একজন বিশিষ্ট গবেষক। আনন্দ মোহন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহের লোকসংস্কৃতি নিয়ে তাঁর বহু গবেষণা প্রবন্ধ দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং নবীন লেখকদের জন্য নিরন্তর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি একজন জনপ্রিয় কবি এবং শিক্ষানুরাগী। ছড়া ও কবিতার মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা শুরু করে তিনি বর্তমানে শাপলাকুঁড়ি বিদ্যানিকেতনের পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'মহাসঙ্গমে' পাঠকমহলে সমাদৃত। তিনি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন এবং নেত্রকোণা অঞ্চলের সৃজনশীল সাহিত্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন।
তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম দিককার সদস্য। হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি করা এই মনীষী 'গণ-অংশগ্রহণমূলক গবেষণা' পদ্ধতির প্রবর্তক। তিনি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও গবেষক হিসেবেও সমাদৃত। উন্নয়ন অর্থনীতি ও সামাজিক দর্শনে তাঁর অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এবং তিনি অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
আনোয়ার উদ্দিন নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন খ্যাতিমান যাত্রা ও পালাশিল্পী ছিলেন। বিংশ শতাব্দীতে তিনি বিভিন্ন পেশাদার যাত্রাদলের সাথে যুক্ত থেকে অসংখ্য মঞ্চসফল পালায় অভিনয় করেন। তার অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ জনপদে লোকসংস্কৃতি এবং নাট্যকলাকে জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
তিনি নেত্রকোণার চন্দ্রনাথ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ এবং একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে 'গাঙপাড়ের মানুষ' এবং প্রবন্ধগ্রন্থ 'মানুষের মুক্তি' উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি নাট্যকার হিসেবেও সুপরিচিত। নেত্রকোণা অঞ্চলের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে তিনি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তিনি সংগীত প্রশিক্ষক ও লেখক হিসেবে সুপরিচিত। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী এই ব্যক্তিত্ব এশিয়া সংগীত একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। গ্রামীণ জনপদে সংগীত শিক্ষার প্রসারে তিনি নিরলস কাজ করছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে নেত্রকোণার কৃষ্টি ও ঐতিহ্য রক্ষায় তিনি নিবেদিত এবং তাঁর ছাত্ররা জাতীয় পর্যায়ে কাজ করছেন।
তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এবং বিশিষ্ট উদ্ভিদ বিজ্ঞানী। জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনকারী এই বিজ্ঞানী উদ্ভিদ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও আণবিক জীববিজ্ঞানে মৌলিক গবেষণা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও উচ্চশিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান বাংলাদেশে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক। তিনি ১১ নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও গবেষক।
আনোয়ারা বেগম নেত্রকোণা অঞ্চলের সুপরিচিত নারী বাউলশিল্পী ছিলেন। তিনি মালেজোড়া গানে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন এবং ১৯৮৮ সালে লন্ডনে গান পরিবেশন করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পান। বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে তিনি হাওড় অঞ্চলের লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
আনোয়ারুল আলম খান চৌধুরী ছিলেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একজন নির্ভীক শহীদ। ১৯৭১ সালে তিনি বিএলএফ-এ যোগ দিয়ে ভারতে প্রশিক্ষণে যান। প্রশিক্ষণ চলাকালে অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধের স্পৃহায় তা গোপন রেখেছিলেন, যা পরবর্তীতে মারাত্মক রূপ নিলে তিনি হাসপাতালে শাহাদতবরণ করেন।
আনোয়ারুল হক ভুঞা ১১ নং সেক্টরের অধীনে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। তিনি প্রবাসী সরকারের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা এই বীর সেনানী ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
অধ্যাপক আনোয়ারুল হাকিম খান একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও লেখক ছিলেন। তিনি ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেন। স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর তার গবেষণামূলক প্রবন্ধ এবং অনুবাদ কর্ম পাঠক ও পণ্ডিত মহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি কর্নেল তাহেরের ছোট ভাই এবং ১৯৭১ সালে ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন। উদ্ভিদ জিন প্রকৌশলে তার আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও অবদান রয়েছে।
নেত্রকোণা সরকারি কলেজে দীর্ঘ ১৬ বছর শিক্ষকতা করা এই অধ্যাপক গণশিক্ষা আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক। তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠাগার বিকাশ কার্যক্রমের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। ফোকলোর পরিষদের মাধ্যমে তিনি লোক গবেষকদের উৎসাহিত করেন। নেত্রকোণা অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে পঠন অভ্যাস তৈরিতে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
আফাজ উদ্দীন বিংশ শতাব্দীর নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন জনপ্রিয় যাত্রা অভিনেতা ছিলেন। তিনি ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোতে অত্যন্ত নিপুণভাবে অভিনয় করতেন। বিভিন্ন বিখ্যাত যাত্রাদলে যুক্ত থেকে তিনি গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষকে সুস্থ বিনোদন ও সাংস্কৃতিক প্রেরণা যুগিয়ে যাত্রা শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তিনি বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একজন বরেণ্য আইনজীবী এবং সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাসহ দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলার আইনজীবী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবেও কাজ করেছেন। আইনি অঙ্গনে তাঁর পাণ্ডিত্য ও অভিজ্ঞতা এদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য এবং জাতীয় সংসদের হুইপ। তিনি পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এলাকার প্রশাসনিক সংস্কারে ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোকসংগীত শিল্পী। 'এই দিন দিন নয়' গানটি গেয়ে তিনি দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা পান। কিচ্ছা বা পালগানকে তিনি আধুনিক প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। দেশ-বিদেশে গান পরিবেশন করে তিনি নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন এবং অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর পরিবেশনা লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য সম্পদ।
আবদুল মজিদ নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত কবিয়াল ছিলেন। যদিও তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তবে তার প্রধান পরিচিতি গড়ে ওঠে কবিগান পরিবেশনার মাধ্যমে। লোকসংস্কৃতির এই শক্তিশালী ধারায় তার দক্ষতা ও উপস্থিত বুদ্ধি তাকে অঞ্চলের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। (৪১ শব্দ)
ডা. আবদুল মজিদ ভূঞা একজন ঐতিহ্যপ্রেমী প্রাবন্ধিক ছিলেন। তার লিখনী ছিল অত্যন্ত গতিশীল ও সাবলীল। তিনি 'খাজা দীঘির ইতিবৃত্ত' ও 'কেন্দুয়ার একাল ও সেকাল' শীর্ষক গবেষণামূলক প্রবন্ধের মাধ্যমে নিজ এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন, যা স্থানীয় ইতিহাস চর্চায় অত্যন্ত মূল্যবান। (৪১ শব্দ)
আবদুল হাই নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন বর্ষীয়ান যাত্রাশিল্পী ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল বিভিন্ন পেশাদার ও শৌখিন যাত্রাদলে কাজ করেছেন। লোকসংস্কৃতির প্রতি তার নিষ্ঠা এবং অভিনয়ের সাবলীলতা তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তার প্রয়াণ নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেল হত্যা মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও জেলহত্যা মামলার প্রধান তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে ১১ নম্বর সেক্টরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
তিনি একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও গবেষক। ব্রিটিশ আমলে বাংলার মুসলিম শিক্ষা এবং নেত্রকোণার শিক্ষার ইতিহাস নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক বিবর্তন নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। তাঁর কাজ আধুনিক ইতিহাস চর্চায় এবং নেত্রকোণা অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার বিবর্তনের নথিবদ্ধকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শহীদ আবদুস সাত্তার ছিলেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, যাকে সাহসিকতার জন্য 'বীর বিক্রম' খেতাবে ভূষিত করা হয়। ইবিআর-এ কর্মরত অবস্থায় তিনি ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধে অংশ নেন। যশোর সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে লড়াইকালে শত্রুর গুলিতে তিনি বীরোচিতভাবে শাহাদতবরণ করেন।
তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং পেশায় শুল্ক কর্মকর্তা। তাঁর রচিত 'হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধ: রণাঙ্গনে নেত্রকোণা' গ্রন্থটি জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে পরিচিত। তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাহিত্যিক সংগঠনের সাথে জড়িত থেকে গবেষণামূলক লেখনীর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও চেতনা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন।
মোহাম্মদ আবু আব্বাছ ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য এবং একজন সফল সমাজসেবক। তিনি নেত্রকোণায় বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন মহাবিদ্যালয় ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রকাশনা ব্যবসায় তার সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবায় তার অবদান নেত্রকোণাবাসীর কাছে তাকে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখবে।
কর্নেল আবু তাহের ছিলেন বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং ১১ নং সেক্টরের কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা প্রদর্শনকালে তিনি পা হারান। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৬ সালে এক সামরিক আদালতের রায়ে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়, যা রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বিশিষ্ট পরিবেশ গবেষক। পরিবেশ রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক 'অশোকা পুরস্কার' পেয়েছেন। ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হিসেবে কাজ করা এই ব্যক্তিত্ব নেত্রকোণা ও বাংলাদেশের নদী ও প্রকৃতি রক্ষায় নিরলস ভূমিকা পালন করছেন, যা জাতীয়ভাবে স্বীকৃত।
তিনি একজন জনপ্রিয় কবি, ছড়াকার এবং গবেষক। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা নিয়ে তাঁর গবেষণা ও উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। তাঁর ১৮টিরও অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি 'পাদদেশ' নামক ছোটকাগজ সম্পাদনা করেন। নেত্রকোণা অঞ্চলের লোকজীবন ও বৈচিত্র্যময় সমাজকে তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
আবু সিদ্দিক আহমেদ ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর টাইগার কোম্পানির সাহসী কমান্ডার। তার বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে নেত্রকোণা শহর পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয়। তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবেও জনসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। দেশপ্রেম ও নেতৃত্বের গুণে তিনি নেত্রকোণার রাজনৈতিক ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের একজন পেসার। ২০১৫ বিপিএলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের হয়ে দারুণ পারফরম্যান্স করে পরিচিতি পান এবং ২০১৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে।
তিনি বেতার ও টেলিভিশনের একজন কৃতি গীতিকার ও সুরকার। ওস্তাদ আব্দুল মজিদ তালুকদারের পুত্র হিসেবে তিনি লোকসংগীতের ঐতিহ্য বহন করছেন। তিনি ১০০০-এর বেশি গান এবং ১২টি পথনাটক রচনা করেছেন। জনসচেতনতামূলক কাজ ও সমাজ সংস্কারে তাঁর গান ও নাটকের অবদান প্রশংসনীয়। নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণে তিনি নিবেদিতপ্রাণ।
আবুল হোসেন সরকার নেত্রকোণার প্রখ্যাত বয়াতি ও কবিয়াল ছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় কবিগানের ঐতিহ্য রক্ষা করেছেন এবং জনপ্রিয় পালাগান পরিবেশন করতেন। এছাড়া তিনি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও চেয়ারম্যান হিসেবে সামাজিক দায়িত্ব পালন করে এলাকার উন্নয়নে ও লোকসংস্কৃতির প্রসারে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
আবেদ আলী নেত্রকোণার একজন প্রখ্যাত মরমি বাউল শিল্পী ছিলেন। তিনি প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেন এবং তার একাধিক গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সংগীত মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। লোকসংস্কৃতির বিকাশে এবং আধ্যাত্মিক সংগীতের প্রসারে তার অবদান আজও অতুলনীয়।
আব্দুর রব বিংশ শতাব্দীর একজন উঁচুমাপের যাত্রা অভিনেতা ছিলেন। তিনি কৃষ্ণাকলি ও নবরঞ্জনের মতো স্বনামধন্য দলে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন। তার বলিষ্ঠ অভিনয়শৈলী এবং মঞ্চে সাবলীল উপস্থিতির কারণে তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সমাদৃত শিল্পী ছিলেন।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত বাউল শিল্পী। ওস্তাদ চঁান মিয়া ও বাউল আজাদ মিয়ার শিষ্য হিসেবে তিনি লোকসংগীতের চর্চা করছেন। বেহালা বাজিয়ে গান গাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তিনি বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী। আধ্যাত্মিকতা ও মানবপ্রেমের গান গেয়ে তিনি গ্রামীণ লোকসংস্কৃতিকে কয়েক দশক ধরে সমৃদ্ধ করছেন।
তিনি কবিতা, জারিগান ও বাউল গানে দক্ষ একজন লোকশিল্পী। ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে পুঁথি রচনা করা তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে 'রক্তে লেখা পুঁথি' অন্যতম। নেত্রকোণা অঞ্চলের গ্রামীণ সমাজে লোকসংগীতের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধিতে তিনি কাজ করছেন। তাঁর লেখনীতে মাটি ও মানুষের সুখ-দুঃখের প্রতিচ্ছবি সার্থকভাবে ফুটে ওঠে।
আব্দুর রহিম তালুকদার বিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত যাত্রা অভিনেতা ও পরিচালক ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে জারীগানের বয়াতি হলেও পরবর্তীতে অভিনেতা হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা পান। যাত্রা শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে এবং এই শিল্পের প্রসারে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
খান সাহেব আব্দুল আজিজ আহমদ মোহনগঞ্জ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। তিনি এই অঞ্চলে একাধিক উচ্চ বিদ্যালয় ও ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। জনহিতকর কাজে অসামান্য অবদানের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাকে সম্মানজনক ' khan সাহেব' উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
আব্দুল আজিজ গণি ছিলেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন আত্মত্যাগী শহীদ। স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে তিনি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং পাক হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি বন্দি অবস্থায় শাহাদতবরণ করেন। তার বীরত্ব নেত্রকোণাবাসীর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রামী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। দীর্ঘ ৪০ বছর শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে কাজ করেছেন। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে চলেছেন। বর্তমানেও তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন অভিভাবক ও বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে শ্রদ্ধেয়।
সৈয়দ আব্দুল খালেক একাধারে একজন জনদরদী চিকিৎসক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি কেন্দুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ছিলেন। এলাকায় তিনি চিকিৎসক হিসেবে যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তেমনি রাজনীতিক ও জনহিতৈষী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তার যথেষ্ট সুখ্যাতি ও সামাজিক প্রভাব ছিল।
আব্দুল জব্বার ছিলেন একজন মরমী কণ্ঠশিল্পী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। তিনি কেন্দুয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে নেত্রকোণার লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করতে আজীবন কাজ করেছেন।
আব্দুল জব্বার আনছারী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি ভারতের যুব ক্যাম্প পরিচালনা এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর তিনি কলমাকান্দা এলাকায় স্কুল, কলেজ ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা পালন করেন।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের লম্বাগীত ও জারিগানের একজন দক্ষ বয়াতী। ওস্তাদ মনসুর বয়াতীর শিষ্য হিসেবে তিনি বহু পালা ও কিচ্ছা মুখস্থ পরিবেশন করেন। টেলিভিশনের 'কথামালা' অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। গ্রামীণ জনপদে কিচ্ছা শুনিয়ে মানুষের মাঝে বিনোদন ও নীতিশিক্ষা প্রদান করে আসছেন, যা লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহায়ক।
আব্দুল জব্বার ছিলেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন নির্ভীক শহীদ। ১৯৭১ সালে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নেত্রকোণার আটপাড়া সীমান্ত ক্যাম্পে পাকিস্তানি বাহিনীর অ্যামবুশে পড়ে তিনি বীরত্বপূর্ণভাবে শাহাদতবরণ করেন। তার এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং ১৯৭৩ সালে ময়মনসিংহ-২০ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আব্দুল মজিদ তালুকদার ছিলেন পল্লীসংগীত ও বাউল তত্ত্বের এক কিংবদন্তি শিল্পী। ১৯৪৫ সালে নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলনে গান গেয়ে তিনি খ্যাতি পান। তিনি অসংখ্য সংগীত রচনা করেছেন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত প্রগতিশীল চেতনার গান গেয়েছেন।
মো. আব্দুল মজিদ নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন সার্থক নাট্যশিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল গ্রামীণ নাট্যাঙ্গনে অসাধারণ অভিনয়শৈলী প্রদর্শন করে সুনাম ও মর্যাদা অর্জন করেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি অভিনয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বিনোদন ও সাংস্কৃতিক মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি একজন সৃজনশীল কৃষক বিজ্ঞানী। তিনি ধানের চারা রোপণ ও গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের জন্য 'হাইপা' নামক একটি সাশ্রয়ী কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। তাঁর এই উদ্ভাবন বাংলাদেশের বহু জেলার কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতিতে আধুনিক প্রযুক্তির সহজ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের অন্যতম প্রবীণ বাউল শিল্পী। ওস্তাদ সুরুজ মিয়ার কাছে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি বাউল সংগীতে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নেত্রকোণা বাউল সমিতি পরিচালিত গান বিদ্যালয়ের প্রশিক্ষক হিসেবে নতুন প্রজন্মকে তৈরি করছেন। লোকসংস্কৃতি ও বাউল ঘরানার ঐতিহ্য রক্ষায় তাঁর একনিষ্ঠ সাধনা জেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিশেষভাবে স্বীকৃত।
তিনি নেত্রকোণায় 'বৃক্ষপ্রেমিক আব্দুল হামিদ' নামে পরিচিত। তিনি কয়েক হাজার তালবীজ ও ঔষধি চারা রোপণ ও বিতরণ করেছেন। হাওর অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় তিনি তাল গাছ লাগানোর আন্দোলন শুরু করেন। ভেষজ ওষুধের মাধ্যমে মানুষের সেবার পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় তাঁর নিঃস্বার্থ অবদান জেলায় একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
মৌলভী আব্দুল হামিদ খান দীর্ঘ ২২ বছর খলিশাউড় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি উচ্চশিক্ষা শেষে সমাজসেবায় নিয়োজিত হন এবং ১৯৩৫ সালে মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। অত্র অঞ্চলের ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নে এবং জনসেবায় তার অসামান্য অবদান আজো মানুষের মাঝে স্মরণীয়।
তিনি মরমী কবি জালাল উদ্দিন খাঁর কনিষ্ঠ পুত্র এবং একজন নিবেদিতপ্রাণ বাউল সাধক। বাবার বাউল সংগীতের ঐতিহ্যকে তিনি ধারণ করে বিভিন্ন আসরে গান গেয়ে আসছিলেন। এক সড়ক দুর্ঘটনায় বর্তমানে শারীরিকভাবে কিছুটা সীমাবদ্ধ হলেও নেত্রকোণার বাউল সমাজে তাঁর পরিবারের সংগীত সাধনার ধারাটি তিনি সচল রেখেছেন এবং বাউল দর্শনের প্রচার করছেন।
আব্দুল হেকিম বয়াতি ছিলেন কিসসা গান ও লোকজ সংস্কৃতির এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ। তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনপ্রিয় পালা পরিবেশন করে বিশেষ সুনাম অর্জন করেন। আমৃত্যু লোকসংগীতের এই ধারাকে লালন করা এই শিল্পী তার অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতার মাধ্যমে লোকসংস্কৃতিতে সমৃদ্ধি এনেছেন।
আব্দুল হেকিম সরকার নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন যশস্বী বাউল ছিলেন। তিনি তার মরমী সংগীত ও মালেজোড়া গানের মাধ্যমে কয়েক দশকব্যাপী জনপ্রিয়তা বজায় রাখেন। লোকসংগীতের প্রচার ও প্রসারে তার অবদান নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি বিটিভির অনুষ্ঠানেও তার প্রতিভা প্রদর্শন করেছেন।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রতিভাবান কবি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে 'সোমেশ্বরীর তীরে' ও 'নক্ষত্রের আগমন' অন্যতম। তাঁর কবিতায় সোমেশ্বরী নদী ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রা এবং শৈশবের স্মৃতি নিপুণভাবে ফুটে ওঠে। আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় তিনি নেত্রকোণার আঞ্চলিক অনুভূতিগুলোকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করে আসছেন, যা বোদ্ধামহলে বেশ প্রশংসিত।
আব্দুস সাত্তার ছিলেন প্রখ্যাত বাউল সাধক উকিল মুনশির পুত্র। তিনি আঞ্চলিক শব্দের সাথে ইংরেজি ও আরবি শব্দের সংমিশ্রণে সংগীত রচনায় দক্ষতা দেখিয়ে 'পল্লীর নজরুল' হিসেবে পরিচিতি পান। বিরহী ধারার এই শিল্পী সহস্রাধিক গান রচনা করে নেত্রকোণার লোকসংগীতের ভাণ্ডারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
আব্দুস সালাম ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন শহীদ বীর সেনানী। মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে তিনি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন এবং সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে লড়াইকালে শাহাদতবরণ করেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এই মুক্তিযোদ্ধার আত্মদান বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথে এক অনন্য গৌরবময় অধ্যায়।
তিনি বর্তমানে 'বাউল সালাম' নামে পরিচিত নেত্রকোণা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অত্যন্ত জনপ্রিয় শিল্পী। ওস্তাদ আবেদ আলীর শিষ্য এই শিল্পী অসংখ্য অ্যালবামে কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর গাওয়া অনেক গান লোকমুখে সমাদৃত। তিনি বিদেশেও বাউল গান পরিবেশন করে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন এবং বর্তমানে লোকসংগীত জগতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন।
হাজী আমির উদ্দিন মুন্সী ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের প্রখ্যাত বাউল সাধক এবং পুঁথি লেখক। তার রচিত পুঁথি লোকসাহিত্যের একটি অমূল্য সম্পদ। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে গান রচনায় পারদর্শী ছিলেন। তার সৃষ্টিতে সমকালীন সমাজ বাস্তবতা এবং মরমি সাধনার গভীর প্রকাশ দেখা যায়, যা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
আমির উদ্দীন ভূঞা নেত্রকোণায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং রেলপথ স্থাপনের দাবিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও আইনি সহায়তায় নিবেদিত ছিলেন। তার দূরদর্শী চিন্তা ও সমাজসেবা নেত্রকোণা অঞ্চলের আধুনিক রূপান্তরে ও জনকল্যাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
তিনি নেত্রকোণার দুর্গাপুর অঞ্চলের একজন নিভৃতচারী বাউল শিল্পী। গ্রামীণ জনপদে ঘুরে ঘুরে তিনি ভক্তিমূলক ও দেহতত্ত্বের গান পরিবেশন করেন। চরম দারিদ্র্যের মাঝেও সংগীতের প্রতি তাঁর অটুট ভালোবাসা লক্ষণীয়। তিনি মরমী কবিদের গান গেয়ে লোকসংস্কৃতির ধারাকে সচল রাখছেন এবং স্থানীয় মঞ্চে তাঁর পরিবেশনা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
শহীদ আরজ আলী নেত্রকোণা সরকারি কলেজের অধ্যাপক এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী তাকে আটক করে এবং অমানুষিক নির্যাতনের পর নির্মমভাবে হত্যা করে। তার এই মহান আত্মত্যাগের সম্মানে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে, যা তার দেশপ্রেমের স্বীকৃতি বহন করে।
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক এবং সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী। তিনি মোহনবাগানসহ বিভিন্ন নামী ক্লাবে খেলেছেন। ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও মধ্যমাঠের খেলোয়াড়। তিনি নেত্রকোণা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
আল আজাদ নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সংগঠক ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে লেখালেখি করেছেন এবং একাধিক কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। তার অসামান্য সাংবাদিকতা ও সামাজিক অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হন, যা নেত্রকোণার বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে ঋদ্ধ করেছে।
আলকাছ উদ্দিন আহমেদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নেত্রকোণার বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি স্কাউটসের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ক্রীড়া ও স্কাউটিংয়ে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি পদক লাভ করেন এবং বারহাট্টার শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে আমৃত্যু কাজ করেছেন।
তিনি নেত্রকোণার একজন সক্রিয় সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মী। 'হিমু পাঠক আড্ডা'র মাধ্যমে তিনি সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির মাধ্যমে তিনি অসংখ্য নিপীড়িত নারীকে আইনি ও সামাজিক সহায়তা প্রদান করছেন। নেত্রকোণা জেলায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে তিনি এক সাহসী নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আলম ওরফে নিখিল চন্দ্র সর্বহারা পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আমৃত্যু রাজনৈতিক আন্দোলনে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালে মোহনগঞ্জ থানায় একটি অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদতবরণ করেন, যা তার আদর্শনিষ্ঠার প্রমাণ।
তিনি নেত্রকোণার একজন আধুনিক কবি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'আশ্চর্য চিতার গান' পাঠকমহলে বেশ আলোচিত হয়েছে। তিনি আধুনিক কবিতার আঙ্গিকে মানুষের জীবনবোধ ও সামাজিক অসঙ্গতিগুলোকে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন। নেত্রকোণা অঞ্চলের সাহিত্য অঙ্গনে তিনি একজন তরুণ প্রতিভাবান কবি হিসেবে নিয়মিত অবদান রাখছেন এবং কবিতার চর্চা প্রসারে কাজ করছেন।
আলী উছমান একজন শ্রমিক হয়েও দেশের টানে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ভারত থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সম্মুখ যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদতবরণ করেন। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে, যা তার বীরত্বকে অমর করে রেখেছে।
আলী উছমান সিদ্দিকী নেত্রকোণার প্রকাশনা ও পাঠাগার আন্দোলনে অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। তিনি পত্রিকার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি করেন এবং সাধারণ পাঠাগারের প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চার প্রসারে নেত্রকোণা অঞ্চলে তার এই অবদান পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক আলোকবর্তিকা স্বরূপ।
সাবেক সংসদ সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী দলের নেতা। ১৯৭৯ ও ১৯৮৮ সালে তিনি নেত্রকোনা থেকে নির্বাচিত হন। কৃষির উন্নয়নে তিনি কাজ করেছেন এবং সাবেকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে তৃণমূলের মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন।
আলী হোসেন সরকার নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতির এক কিংবদন্তি শিল্পী ছিলেন। তিনি কবিগান, জারিগান এবং বাউলগানে সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন। বিদেশে গান পরিবেশন করে তিনি আন্তর্জাতিক প্রশংসা ও স্বর্ণপদক লাভ করেন। লোকসংস্কৃতির ধারক হিসেবে তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলে চিরস্মরণীয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মহান পুরুষ।
সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং মুক্তিযোদ্ধা। তিনি নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করেছেন।
নেত্রকোণা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭১ সালে তিনি কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
নেত্রকোণা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং ১১ নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা। তিনি নেত্রকোণা জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।
তিনি একজন দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা এবং একই সাথে নিবেদিত সাহিত্যিক। তাঁর প্রকাশিত বই 'বিষণ্ণ অবেলায়' কাব্য সাহিত্যে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের সাথে জড়িত থেকে তিনি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছেন। প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর নিরলস সাহিত্য সাধনা নেত্রকোণা জেলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের এক অনন্য সংযোজন।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রতিষ্ঠিত কবি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'দস্তখত' ও 'কালবুনন' উল্লেখযোগ্য। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত লেখালেখি করছেন। তাঁর কবিতায় গ্রামীণ বাংলার নিসর্গ ও মানুষের জীবনযুদ্ধের চিত্র অত্যন্ত সাবলীলভাবে উঠে এসেছে, যা নেত্রকোণার সাহিত্যিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আশালতা সিংহ বিংশ শতাব্দীর নেত্রকোণা অঞ্চলের প্রথম সারির একজন খ্যাতনামা নারী কথাশিল্পী ছিলেন। তিনি একাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস রচনা করেছেন। তার নিপুণ লেখনীর মাধ্যমে নেত্রকোণার আধুনিক কথাসাহিত্য চর্চার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, যা এই অঞ্চলের নারী শিক্ষা ও সাহিত্য বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি নেত্রকোণা জেলা শিল্পকলা একাডেমির নাট্য প্রশিক্ষক এবং গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের একজন অগ্রণী কর্মী। 'ঢাকা পদাতিক' নাট্যদলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তাঁর নির্দেশনায় বহু নাটক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারও লাভ করেছেন। নেত্রকোণার নাট্যচর্চাকে আধুনিক ও গতিশীল করতে তাঁর অবদান অপরিসীম।
তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার একজন শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তাঁর অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে 'আদিপৃথিবীর গান' উল্লেখযোগ্য। কবিতার পাশাপাশি তিনি লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক গবেষণা নিয়ে কাজ করেন। তাঁর লেখনীতে দার্শনিক বোধ ও মানুষের মুক্তির চেতনা প্রধান হয়ে ওঠে। তিনি জাতীয়ভাবে স্বীকৃত কবি এবং একটি এনজিওর নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও কর্মরত।
আহসান আলী মোক্তার অবিভক্ত বাংলার এমএলএ ছিলেন। তিনি নেত্রকোণা কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং শহরের প্রথম বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় এবং শিক্ষা বিস্তারে তার দীর্ঘদিনের অবদান নেত্রকোণার উন্নয়ন ও ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
আয়েশা খানম বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত এবং মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ছিলেন। তিনি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। আমৃত্যু তিনি নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় জোরালো ভূমিকা পালন করেছেন, যা তাকে এদেশের নারী জাগরণের এক অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছে।
ইংরাজ মুন্সী ছিলেন নেত্রকোনা অঞ্চলের বিশ শতকের চল্লিশের দশক থেকে সত্তরের দশকের একজন প্রভাবশালী বাউল গায়ক। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি এ অঞ্চলে বাউল সংগীতের চর্চা করেন। তবে তার জীবন সম্পর্কে উৎস উপকরণে বিস্তারিত কোনো তথ্য বা জন্ম-মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যায়নি।
মো. ইছাক আহাম্মদ একজন বিশিষ্ট নাট্য অভিনেতা ছিলেন। তিনি শৈশব থেকেই বিভিন্ন নাটক ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জনমনে গভীর ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। পেশাগত জীবনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেও অভিনয়ের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল এবং তিনি স্থানীয় নাট্যাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ইদ্রিস আলী ছিলেন নেত্রকোনার শীর্ষস্থানীয় বাউল সম্রাট ও তাত্ত্বিক। তিনি বিখ্যাত বাউল রশিদ উদ্দিনের কাছে দীক্ষা নেন এবং বাউল গানের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় অসাধারণ পারদর্শিতা অর্জন করেন। মঞ্চে বাউল তত্ত্ব আলোচনায় তাকে কেউ কখনো হারাতে পারত না, যা তাকে এ অঞ্চলের বাউল সংগীত জগতে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।
ডক্টর এম ইন্নাস আলী একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়।
মুহম্মদ ইব্রাহীম খাঁ উত্তর-পূর্ব ময়মনসিংহে আধুনিক শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের পথিকৃৎ ছিলেন। তিনি মোহনগঞ্জে একটি ছাপাখানা ও কলঘর প্রতিষ্ঠা করে মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। মুসলমান সমাজে শিক্ষার আলো ছড়াতে তিনি বহু স্কুল-মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন এবং বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে গান রচনা করেন।
তিনি নেত্রকোণার একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। তাঁর প্রকাশিত ১০টি বইয়ের মধ্যে 'নিষিদ্ধ লোবানের ঘ্রাণ' উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে তিনি বর্তমানে নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করছেন। তাঁর গল্প ও উপন্যাসে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, যা আধুনিক বাংলা কথা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করেছে।
তিনি দুই বাংলার একজন জনপ্রিয় আবৃত্তি শিল্পী এবং কবি। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে 'ছুঁয়ো না স্পর্শ করো' অন্যতম। আবৃত্তি ও নাট্যনির্দেশনার মাধ্যমে তিনি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছেন। বর্তমানে তিনি সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে নেত্রকোণার শিল্পচর্চাকে সমৃদ্ধ করছেন।
ইসলাম উদ্দিন বয়াতি ছিলেন একজন জননন্দিত বাউল শিল্পী যিনি হুমায়ূন আহমেদের নাটকে গান গেয়ে দেশব্যাপী পরিচিতি পান। তিনি পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলের জনপ্রিয় ‘মালেজোড়া বাউল’ গানের ধারাকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাউল তত্ত্বের গভীর পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি তিনি প্রায় ১৩টি নাটক এবং দুটি চলচ্চিত্রে গান ও অভিনয় করেন।
বাউল ইস্রাইল ছিলেন বিখ্যাত সাধক জালাল উদ্দিন খাঁর প্রধান শিষ্য এবং একজন বিশিষ্ট বাউল ও জারি বয়াতি। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাউল গান গেয়ে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তার রচিত চার শতাধিক গানের মধ্য থেকে ৬০টি গান নিয়ে ‘আশিকের প্রাণ’ নামক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
ঈশান দত্ত ছিলেন বিশ শতকের শুরুর দিকে নেত্রকোনা অঞ্চলের অন্যতম খ্যাতিমান কবিয়াল। তিনি ১৯০০ থেকে ১৯৩০ এর দশক পর্যন্ত প্রায় চার দশক কবিয়ালের আসরে সক্রিয় ছিলেন। তার অসাধারণ কবিপ্রতিভা তাকে সমকালের কবিয়ালদের মধ্যে বিশিষ্ট করে তুলেছিল, তবে তার জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উৎস উপকরণে অনুপস্থিত।
উকিল মুনশি ছিলেন বাংলার প্রখ্যাত বিরহী বাউল সাধক এবং আধ্যাত্মিক গানের স্রষ্টা। তিনি দীর্ঘকাল মসজিদে ইমামতি করার পাশাপাশি অসংখ্য মরমী ও বিচ্ছেদ গান রচনা করেন। তার গান মানুষের হৃদয়ে শোক ও আধ্যাত্মিকতার সংযোগ ঘটায়। হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত তার কালজয়ী গানগুলো তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে অমর করে রেখেছে।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য ছিলেন।
তিনি নেত্রকোণা জেলার একজন কবি এবং পেশায় শিক্ষক। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'পরিভ্রাজক' পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। তাঁর কবিতায় নিসর্গ চেতনা ও মরমীবাদ প্রস্ফুটিত হয়। তিনি মদন ও নেত্রকোণা অঞ্চলের সাহিত্য আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থেকে নতুন প্রজন্মের লেখকদের অনুপ্রাণিত করছেন এবং আধুনিক বাংলা কবিতায় অবদান রাখছেন।
উমেদ আলী ফকির ছিলেন বিশ শতকের ত্রিশ থেকে ষাটের দশকের একজন জনপ্রিয় বাউল গায়ক ও লোককবি। তিনি নেত্রকোনা অঞ্চলে বাউল গানকে জনপ্রিয় করতে অনন্য অবদান রাখেন। তার কাব্যিক প্রতিভা এবং সুরের মাদকতা গ্রামীণ মানুষকে গভীরভাবে বিমোহিত করত, যা এ অঞ্চলের লোকসংগীতের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন একজন খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক। তার গবেষণাধর্মী ও চিন্তাশীল প্রবন্ধ ময়মনসিংহের ‘সৌরভ’ এবং কলকাতার ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হতো। তিনি ধর্ম, নীতি, আচার এবং বাংলা সাহিত্যের অভাব সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাত্ত্বিক প্রবন্ধ রচনা করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
উমেশচন্দ্র ভদ্র ছিলেন একজন একনিষ্ঠ সমাজসেবক এবং নেত্রকোনার চন্দ্রনাথ হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সুপারিনটেনডেন্ট। তিনি ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্কুলটির উন্নয়নে এবং এ অঞ্চলের শিক্ষার প্রসারে তিনি সারাজীবন নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
রাজা উমেশচন্দ্র সিংহ ছিলেন পূর্বধলার একজন উদার শিক্ষানুরাগী জমিদার। তিনি পূর্বধলা জগৎমণি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দুই দশক দায়িত্ব পালন করেন। এলাকার শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি প্রচুর জমি ও অর্থ দান করেন। তার অক্লান্ত পরিশ্রমে পূর্বধলা অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছিল।
সাবেক পেশাদার গোলরক্ষক যিনি শেখ জামাল ও শেখ রাসেলের মতো ক্লাবে খেলেছেন। বর্তমানে তিনি বসুন্ধরা কিংসের গোলরক্ষক প্রশিক্ষক এবং বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের সাবেক ম্যানেজার হিসেবে পরিচিত।
তিনি একাধারে কবি, লেখক এবং 'অন্তরাশ্রম' নামক সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রকাশিত ১০টি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'মেঘের সন্ন্যাস' উল্লেখযোগ্য। তিনি নেত্রকোণায় 'ভূমি জাদুঘর' প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা। কবিতার পাশাপাশি তিনি প্রাচীন আরবি সাহিত্য অনুবাদে অবদান রেখেছেন। তাঁর কাজের মাধ্যমে নেত্রকোণায় একটি নতুন সাহিত্যিক বলয় তৈরি হয়েছে।
তিনি 'সাপ্তাহিক রাজধানী বার্তা'র সম্পাদক এবং একজন বিশিষ্ট সংগঠক। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'কাননে ফুটেনি কুসুম' অন্যতম। নেত্রকোণা অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয়। তাঁর লেখনীতে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ ফুটে ওঠে। তিনি 'নেত্রকোণা লেখক পরিচিতি' সম্পাদনার মাধ্যমে জেলার সাহিত্যিকদের একত্রিত করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছেন।
এলাহি নেওয়াজ খান ছিলেন নেত্রকোনার একজন প্রথিতযশা আইনজীবী এবং আধুনিক শিক্ষার অন্যতম পথপ্রদর্শক। তিনি আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও চন্দ্রনাথ হাই স্কুল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নেত্রকোনা পৌরসভার ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শহরের প্রথম কবরস্থান নির্মাণসহ বহু সামাজিক ও জনহিতকর কাজ সম্পন্ন করেছিলেন।
তিনি বাংলাদেশের ২৪তম প্রধান বিচারপতি। আইনি পেশার পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ লেখক। তাঁর রচিত 'বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ' শীর্ষক গ্রন্থটি ইতিহাস গবেষণায় অত্যন্ত মূল্যবান। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা রক্ষায় তাঁর সুদীর্ঘ ভূমিকা জাতীয়ভাবে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকৃত। তিনি নেত্রকোণার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং বিচার ব্যবস্থায় অনন্য অবদান রাখছেন।
ওবায়দুল হক সরকার ছিলেন বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ এবং প্রখ্যাত চলচ্চিত্র শিল্পী। মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে তার ব্যাপক পদচারণা ছিল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলাদেশের নাটকে নারী-পুরুষের যৌথ অভিনয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কয়েকশত নাটক পরিচালনা ও অভিনয় করেন।
তিনি বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সংসদ সদস্য। একাত্তরের রণাঙ্গনে অদম্য সাহস প্রদর্শন করা এই যোদ্ধা ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রামেও অংশগ্রহণ করেন। নেত্রকোণা ও পূর্বধলা অঞ্চলের উন্নয়নে এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণে তিনি আজীবন নিবেদিত থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমের জীবন জেলার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অংশ।
তিনি নেত্রকোণার একজন প্রবীণ শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব এবং লেখিকা। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ 'ভালোবাসার আথ্য' পাঠকদের মাঝে সমাদৃত হয়েছে। দীর্ঘকাল শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে তিনি সমাজ সংস্কার ও জ্ঞান বিস্তারে কাজ করেছেন। তাঁর লেখনীতে মানবিক সম্পর্ক ও সামাজিক মূল্যবোধের গভীর প্রতিফলন দেখা যায়, যা নারী শিক্ষা প্রসারে সহায়ক।
কবি কঙ্ক ছিলেন মধ্যযুগের একজন প্রখ্যাত কবি এবং বাংলা সাহিত্যের ‘সত্যপীরের পাঁচালী’র আদি রচয়িতা। তার রচিত ‘বিদ্যাসুন্দর’ ও ‘মলুয়ার বারমাসী’ ময়মনসিংহ গীতিকার অমূল্য সম্পদ। ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে থাকা এই মানবপ্রেমিক কবির জীবন ও করুণ প্রণয়কাহিনী আজও এ অঞ্চলের লোকগাথায় ও সাহিত্যে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্মরিত হয়।
তিনি নেত্রকোণার একজন সফল নাট্য অভিনেতা এবং সাংবাদিক। বর্তমানে তিনি 'দৈনিক মানবজমিন' পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। অভিনেতা হিসেবে তিনি বিভিন্ন যাত্রা ও নাট্যদলে অভিনয় করে সুনাম অর্জন করেছেন। তিনি 'রক্তাক্ত কংশ' নামক একটি ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন। বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে তিনি জেলার শিল্প ও সংবাদ জগতে সুপরিচিত।
শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী ছিলেন বাংলার প্রথম সুফি সাধক যিনি নেত্রকোনা অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। বখতিয়ার খলজির আগমনের অনেক আগে তিনি নেত্রকোনায় বসতি স্থাপন করেন। আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা স্থানীয় কোচ রাজাকে প্রভাবিত করে তিনি মদনপুর অঞ্চলে শান্তির বাণী প্রচার করেন, যেখানে আজও তার মাজার অবস্থিত।
কমল মিয়া ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনার বাউল সাধক। বাউল সম্রাট জালাল উদ্দিন খাঁ ছিলেন তার শিক্ষাগুরু। তিনি পারিবারিক সম্পদ হারিয়ে বাউল সাধনায় মগ্ন হন এবং মালেজোড়া বাউল গানে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তার গান মানুষের হৃদয়ের গভীর ব্যথা ও জীবন সংগ্রামের করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলত।
রাজা কমলকৃষ্ণ সিংহ বাহাদুর ছিলেন সুসঙ্গের একজন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও জমিদার। তিনি বাংলা, ফারসী ও উর্দু ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় ‘আর্যপ্রদীপ’ ও ‘কৌমুদী’ নামক উচ্চমানের সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হতো। তিনি মনসামঙ্গল কাব্য ‘পদ্মপুরাণ’ এবং ‘সংগীত শতক’ গ্রন্থ রচনা করে সাহিত্য ও সংগীতে অবদান রাখেন।
হযরত করম শাহ ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী পাগলপন্থী মতাদর্শের প্রতিষ্ঠাতা এবং সুফি সাধক। তিনি ‘সকল মানুষ সমান’ এই সাম্যবাদী মন্ত্রে হিন্দু-মুসলিম ও গারো-হাজং কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন। তার নেতৃত্বে এ অঞ্চলে একটি মানবতাবাদী বিদ্রোহের সূচনা হয় যা জমিদারদের শোষণ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
তিনি নেত্রকোণা-১ আসনের তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং সাবেক হুইপ। নেত্রকোণা জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদীয় গণতন্ত্র ও এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সব সময় অগ্রভাগে ছিলেন এবং আইনি পেশায় নিয়োজিত।
তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী এবং বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা ছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত রেলসেতু সংস্কারে তিনি অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেন। তিনি নিজ এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তাঁর প্রযুক্তিগত অবদান জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (আয়কর বিভাগ) এবং একজন কবি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'এই নির্জনে এই পরবাসে' অত্যন্ত জনপ্রিয়। ১৯৮৩ সালের শিক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে তিনি কারাবরণ করেছিলেন। অর্থনৈতিক গবেষণায় তাঁর 'কালো টাকা' গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মননশীল সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে আসছেন।
তিনি নেত্রকোণা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ। তাঁর নেতৃত্বে মহিলা কলেজে শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে এবং অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। উদার ও আধুনিক মূল্যবোধের এই শিক্ষাবিদ নেত্রকোণা জেলার শিক্ষা প্রসারে এবং সাংস্কৃতিক বলয় তৈরিতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সফলভাবে কাজ করে চলেছেন।
তিনি 'ঢাকা ল্যাবরেটরি স্কুল'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ। শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের পাশাপাশি তিনি 'প্রবচন' ও 'কচি কণ্ঠ' নামক সাহিত্য ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। শিশু-কিশোরদের সুশিক্ষায় তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয়।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন দক্ষ নাট্য অভিনেতা ও সংগীত গুরু। দীর্ঘকাল ধরে তিনি যাত্রা ও নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন। বারহাট্টা শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থী তৈরি করেছেন। নেত্রকোণার যাত্রাশিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রসারে তাঁর অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী।
কামরুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন নেত্রকোনার বিশিষ্ট কবি ও গবেষক। তার উল্লেখযোগ্য গবেষণামূলক গ্রন্থ হলো ‘নেত্রকোনায় রবীন্দ্রচর্চা’ এবং ‘নেত্রকোনায় নজরুলচর্চা’। তিনি নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সভাপতি এবং স্কাউট আন্দোলনের একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন। তার লেখনীতে নেত্রকোনার লোকসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
তিনি বাংলাদেশ বেতারের একজন খ্যাতিমান সংবাদ পাঠক এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক পত্রিকা 'অনিকেত' এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সম্পাদিত 'শিশু কিশোর কবিতার হাজার বছর' গ্রন্থটি সাহিত্যের এক অমূল্য সংগ্রহ। তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্য চর্চায় নিবিড়ভাবে জড়িত থেকে সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধনে কাজ করছেন।
শহীদ কামিনী কুমার চক্রবর্তী ছিলেন একজন নির্লোভ ও জনদরদী শিক্ষক। তিনি নেত্রকোনার চন্দ্রনাথ হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন এবং গ্রামীণ মানুষের শিক্ষার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে মগড়া নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
কালীকান্ত বিদ্যালঙ্কার ছিলেন একজন প্রথিতযশা সংস্কৃত পণ্ডিত ও অধ্যাপক। তিনি ন্যায় ও স্মৃতিশাস্ত্রে অসামান্য ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন এবং কোচবিহার রাজসভায় পণ্ডিত হিসেবে অবস্থান করেন। তার রচিত ‘অষ্টাবিংশতিতত্ত্বাবিশিষ্টঃ’ এবং ‘তিথিতত্ত্বাবিশিষ্টঃ’ প্রভৃতি গ্রন্থ সংস্কৃত শাস্ত্রে তার অগাধ পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর বহন করে।
কালীকুমার দাস বিশ শতকের ত্রিশ থেকে ষাটের দশকের অন্যতম খ্যাতিমান কবিয়াল ছিলেন। তিনি বারহাট্টার বিপিন গুণের শিষ্য হিসেবে কবিয়াল জীবন শুরু করেন। টপ্পার আসরে তার পরিবেশনা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। পারিবারিক ও সামাজিক নানা বাধার মুখেও তিনি আমৃত্যু কবিয়ালের ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলেন।
কালীকুমার ধর ছিলেন বিশ শতকের প্রথম তিন দশকের অন্যতম প্রভাবশালী কবিয়াল। নেত্রকোনার বেতাটি গ্রামে বসবাসরত এই কবিয়াল টপ্পার আসরে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন। তিনি এ অঞ্চলের অনেক কবিয়ালের ওস্তাদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং স্থানীয় লোকসংস্কৃতি বিকাশে তার অবদান অনস্বীকার্য।
কালীকৃষ্ণ তর্কতীর্থ ছিলেন একজন বিশ্ববিখ্যাত নৈয়ায়িক এবং অধ্যাপক। তিনি সুদীর্ঘ ৩৫ বছর রাজরাজেশ্বরী চতুষ্পাঠীর অধ্যক্ষ হিসেবে দেশ-বিদেশের ছাত্রদের দর্শনশাস্ত্র পড়িয়েছেন। তার মেধা ও পাণ্ডিত্যের কারণে সংস্কৃত কলেজ তাকে অধ্যাপনার আহ্বান জানিয়েছিল। ন্যায়শাস্ত্রের ওপর তার অগাধ পাণ্ডিত্য তাকে ভারতের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের আসনে বসিয়েছিল।
কালীচরণ দে ছিলেন সমকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বশিক্ষিত কবিয়াল। তিনি রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ পাঠে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। টপ্পা ও পাঁচালীর আসরে তার ক্ষুরধার বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং গীত রচনার ক্ষমতা লোকমুখে প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। ময়মনসিংহের প্রখ্যাত কবিয়ালদের সাথে একই আসরে লড়াই করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা পান।
কাহ্ন পা বা কনহপা বা কাহ্নিল পা বা কৃষ্ণপাদ বা কৃষ্ণাচার্য্য ছিলেন বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। নেত্রকোনার আটপাড়ার কৃষ্টপুর গ্রামে তার জন্ম বলে অনেক গবেষক দাবি করেন। চর্যাপদের ২৩ জন কবির মধ্যে তার পদসংখ্যা সর্বাধিক (১৩টি)। তার রচিত পদগুলো বৌদ্ধ তান্ত্রিক ও সহজিয়া দর্শনের এক অমূল্য দলিল।
কিঙ্কর শীল ছিলেন বিশ শতকের একজন নামকরা কবিয়াল এবং গোবিন্দ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা একত্রে বসে কাব্যচর্চা ও পদ-পূরণ করতেন। কিঙ্কর শীলের টপ্পায় কবিত্বের ঝংকার ছিল অসাধারণ। জনসমক্ষে আসরে কম উঠলেও ঘরোয়া আসরে তার মেধা ও দক্ষতা কিংবদন্তি কবিয়ালদের সমকক্ষ ছিল বলে স্বীকৃত।
কুটিশ্বর বা কোটিশ্বর ছিলেন নেত্রকোনার একজন প্রতিভাবান অন্ধ কবি। তিনি স্থানীয়ভাবে অসংখ্য ঘাটুগান রচনা করেছিলেন যা গ্রামীণ মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। তার রচিত গানে বিচ্ছেদ ও বিরহের গভীর আর্তি ফুটে উঠত, যা লোকসঙ্গীতের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের পুরোধা। ১৯৭১ সালে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দৈনিক ভোরের কাগজ ও প্রথম আলোর নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা করেছেন।
নেত্রকোণা জেলা সিপিবির অন্যতম নেতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি দৈনিক প্রথম আলো ও ভোরের কাগজের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন এবং বামপন্থী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
হাসানদাদ খান বা কুবাদ মিয়া ছিলেন একজন একনিষ্ঠ বিপ্লবী রাজনীতিবিদ। ছাত্রাবস্থায় তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং দীর্ঘ নয় বছর আত্মগোপনে থাকেন। তিনি যুগান্তর দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য বহু কারাবরণ ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমৃত্যু তিনি প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে অটল ছিলেন।
কুবীর উদ্দিন খান ছিলেন নেত্রকোনা পৌরসভার প্রথম মুসলিম চেয়ারম্যান এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। তিনি নেত্রকোনা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। তার সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। এলাকার অবকাঠামো ও শিক্ষার উন্নয়নে তার অবদান অপরিসীম।
মহারাজা কুমুদচন্দ্র সিংহ ছিলেন সুসঙ্গের একজন উচ্চশিক্ষিত জমিদার এবং প্রথিতযশা সংস্কৃত পণ্ডিত। তিনি আরতি, সৌরভ ও সাহিত্য সংহিতা পত্রিকায় নিয়মিত গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখতেন। তার রচিত প্রবন্ধগুলো ‘কৌমুদী’ নামে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। কলকাতার সংস্কৃত বোর্ডের সদস্য হিসেবে তিনি শিক্ষা সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কুমুদিনী হাজং ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম এবং টংক ও তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নারী নেত্রী। ১৯৪৬ সালে পুলিশ তাকে ধরে নেওয়ার চেষ্টা করলে গারো ও হাজং নারীরা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তিনি আজীবন নারী জাগরণ ও প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
কৃপানাথ তর্করত্ন ছিলেন দুর্গাপুর অঞ্চলের একজন সংস্কৃত পণ্ডিত। তিনি সংস্কৃত ভাষায় একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম ‘ধাতু চন্দ্রিকা’, যা ছন্দে নিবন্ধিত একটি সংস্কৃত গণমালা। প্রাচীন সংস্কৃত চর্চায় তার অবদান এই অঞ্চলের জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অংশ।
কৃষ্ণচন্দ্র স্মৃতিতীর্থ ছিলেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের সংস্কৃত শিক্ষার অন্যতম প্রধান সংগঠক। তিনি গঁাসাই-চান্দ্রা গ্রামে একটি চতুষ্পাঠী স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে সংস্কৃত শিক্ষার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তিনি ময়মনসিংহ সিটি কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং স্মৃতিশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য ‘তর্কালঙ্কার’ উপাধি লাভ করেন।
কৃষ্ণা চক্রবর্তী ছিলেন বাংলাদেশের যাত্রা শিল্পের এক কিংবদন্তি অভিনেত্রী। তিনি ‘সিরাজউদ্দৌলা’সহ বহু যাত্রাপালায় পুরুষ ও নারী উভয় চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি ‘রামকৃষ্ণ যাত্রা ইউনিট’ এবং পরে ‘কৃষ্ণা অপেরা’ নামে নিজস্ব যাত্রাদল পরিচালনা করে এ শিল্পকে সমৃদ্ধ করেন।
তিনি নেত্রকোণা জেলা মহিলা পরিষদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক এবং একজন নিবেদিত মানবাধিকার কর্মী। বিশেষ করে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নারীদের আইনি সহায়তা দানে তাঁর সুদীর্ঘ ৩০ বছরের ভূমিকা প্রশংসনীয়। তিনি নেত্রকোণা জেলায় নারী জাগরণ ও মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে একজন অন্যতম পুরোধা হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি ২০১৯ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাঁতারু। ২০১৮ সালে কংস ও মগড়া নদীতে ১৮৬ কিলোমিটার সাঁতার কেটে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও তিনি অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর এই অবিশ্বাস্য ক্রীড়া নৈপুণ্য নেত্রকোণা ও বাংলাদেশের সুনাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করছে।
ক্ষেত্রমোহন শীল ছিলেন নেত্রকোনা অঞ্চলের একজন বিখ্যাত কবিয়াল। তিনি বিশ শতকের ত্রিশ থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত টপ্পার আসরে অত্যন্ত সক্রিয় ও জনপ্রিয় ছিলেন। তার শাস্ত্রীয় জ্ঞান এবং তাৎক্ষণিক কবিত্বশক্তি তাকে সমকালের কবিয়ালদের মাঝে বিশিষ্ট স্থান করে দিয়েছিল।
খগেশ কিরণ তালুকদার ছিলেন একজন বিশিষ্ট গবেষক এবং অধ্যাপক। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ময়মনসিংহের লোকায়ত শিল্পকলা’। তিনি বাংলাদেশের প্রথম অণু পত্রিকা ‘চৈরেবেতি’র সম্পাদক ছিলেন। একই সাথে তিনি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এবং শিক্ষক সমিতির সাথে যুক্ত থেকে সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী আন্দোলনে অবদান রেখেছেন।
খন্দকার সফিকুল ইসলাম ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের একজন নিবেদিত ইতিহাস গবেষক। তার রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ইতিহাসের পাতায় কেন্দুয়া’। তিনি ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক পরিষদ থেকে ‘সংস্কৃতিবিবুধ’ উপাধি পান এবং সারাজীবন আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।
খমীর উদ্দীন ছিলেন একজন প্রখ্যাত যাত্রা অভিনেতা ও লোকসাহিত্য সংগ্রাহক। দীর্ঘ ১৮ বছরের যাত্রাজীবনে তিনি বহু পালায় অভিনয় করেছেন এবং ‘কৃষ্ণাকলি’ অপেরার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। লোকসাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি আমৃত্যু সরকারি ভাতা ও স্বীকৃতি লাভ করেন।
খলিলুর রহমান ছিলেন একজন শক্তিশালী কবি ও সাংবাদিক যিনি মাসিক ‘ভোরের সানাই’ ও সাপ্তাহিক ‘জুলফিকার’ সম্পাদনা করতেন। তার রচিত নাটক ‘দস্যু ফরিদ’ অমরাবতী রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তিনি কাব্য ও নাট্য সাহিত্যে বিশেষ করে মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতিফলনে বিশেষ অবদান রাখেন।
খলিলুর রহমান ছিলেন একজন সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা যিনি ১৯৭১ সালে ফেনী ও কুমিল্লার বিভিন্ন রণাঙ্গনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেন। বিলোনিয়া যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর যে দুঃসাহসী আক্রমণ চালিয়েছিলেন তার জন্য সরকার তাকে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করে। তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য অনন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
তিনি একজন প্রতিভাবান কথাসাহিত্যিক এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে 'রিক্ত প্রেম' ও 'অমর প্রেম' উল্লেখযোগ্য। তিনি ঢাকা ওয়াসার রসায়নবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর লেখনী মানুষের জীবনবোধ ও অনুভূতির নিপুণ চিত্র তুলে ধরে।
তিনি নেত্রকোণার যাত্রা ও নাট্য জগতের এক বিশিষ্ট অভিনেতা। দীর্ঘকাল তিনি বিভিন্ন পেশাদার যাত্রাদলে অভিনয় করেছেন। একই সাথে তিনি নেত্রকোণা সদর উপজেলার দুইবারের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান। সামাজিক উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা নেত্রকোণার সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।
খালেকদাদ চৌধুরী ছিলেন নেত্রকোনার প্রথিতযশা সাহিত্যিক এবং মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সৃজনী’র সম্পাদক। কাজী নজরুল ইসলাম তাকে ‘আতসবাজ’ ছদ্মনাম দিয়েছিলেন। তার উপন্যাস ‘চাঁদবেগের গড়’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘একটি আত্মার অপমৃত্যু’ বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তিনি এ অঞ্চলের সাহিত্য ও সাংবাদিকতা চর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন।
খুশু দত্ত রায় ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন অগ্নিপুরুষ ও কমিউনিস্ট নেতা। তিনি আন্দামানে নির্বাসিত ছিলেন এবং সেখানে দীর্ঘ অনশন করেন। মুক্তি পেয়ে তিনি নেত্রকোনায় কৃষক ও তেভাগা আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৫ সালের নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলন সফল করতে তার অবদান অবিস্মরণীয়।
খেলু মিয়া ছিলেন একজন প্রতিভাবান বাউল সাধক যার সুমধুর কণ্ঠ ও পরিবেশনা ভঙ্গি সাধারণ মানুষকে মুগ্ধ করত। তিনি বিখ্যাত বাউল রশিদ উদ্দিনের কাছে তালিম নেন এবং অল্প সময়েই দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে একটি বাউল আসরে গান গাওয়ার সময় তিনি মৃত্যুকালে শেষ গানটি রচনা করে মঞ্চেই ঢলে পড়েন।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত করনেট বংশীবাদক। বংশপরম্পরায় এই শিল্পের সাথে জড়িত থেকে তিনি দীর্ঘদিন শিল্পী কুদ্দুস বয়াতীর সহকারী হিসেবে দেশ-বিদেশে অনুষ্ঠান করেছেন। লোকসংগীতের বিভিন্ন অনুষঙ্গে তাঁর বাঁশির সুর এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে, যা লোকসংস্কৃতিকে সজীব রাখতে সহায়তা করছে।
তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং ১১ নং সেক্টরের বাউল কোম্পানিতে যুদ্ধ করেন। দুর্গাপুর ও ধোবাউড়া অঞ্চলের সফল অপারেশনে তিনি বীরত্বের পরিচয় দেন। যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ কৃষক হিসেবে জীবন শুরু করেন। নেত্রকোণার এই সাহসী যোদ্ধার অবদান জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
খোরশেদ আলম ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ পল্লীকবি যিনি মাটি ও মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে আজীবন সাহিত্যচর্চা করেছেন। তিনি কবি রওশন ইজদানীর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। পেশায় শিক্ষক হলেও তার রচিত ‘আমার দেশ’ এবং ধর্মীয় মহাপুরুষদের জীবনীভিত্তিক কাব্যগ্রন্থগুলো গ্রামীণ সমাজে পাঠকদের গভীর সমাদর লাভ করেছে।
খোরশেদ মিয়া ছিলেন বিরহী বাউল উকিল মুনশির অন্যতম প্রধান শিষ্য। শৈশবে দৃষ্টিশক্তি হারালেও সুরের জাদুতে তিনি মানুষের মন জয় করেছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল মালেজোড়া গানে অংশ নিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার গানগুলো আধ্যাত্মিকতা ও মরমী দর্শনে সমৃদ্ধ, যা এ অঞ্চলের বাউল ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ।
তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নেত্রকোণার প্রবীণ সাংবাদিক। পেশায় চিকিৎসক হলেও সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি সমাজ সংস্কারে কাজ করেছেন। তাঁর গ্রন্থ 'মুক্তিযুদ্ধ: আমার প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি' একাত্তরের রণাঙ্গনের এক সত্যনিষ্ঠ দলিল। তিনি বারহাট্টা ও নেত্রকোণা অঞ্চলের সামাজিক উন্নয়নে সুদীর্ঘকাল ধরে কাজ করে আসছেন।
তিনি নেত্রকোণার একজন প্রতিষ্ঠিত গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। তাঁর লেখনীর প্রধান উপজীব্য হলো মুক্তিযুদ্ধ ও গ্রামীণ জীবন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে 'মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত গল্প' উল্লেখযোগ্য। লোকজ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উপাদান নিয়ে তিনি নিয়মিত লিখে চলেছেন এবং নেত্রকোণা জেলার সাহিত্যিক বলয়ে নিবেদিত প্রাণ লেখক হিসেবে পরিচিত।
ওস্তাদ গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী ছিলেন হিন্দুস্থানি উচ্চাঙ্গ সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাস্ত্রীয় শিল্পী ও শিক্ষক। তিনি কলকাতার সংগীত ভারতী ও সংগীতকলা ভবন প্রতিষ্ঠা করেন। ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুংরী সংগীতে তার অগাধ দক্ষতা ছিল। একইসাথে তিনি একজন কুশলী চিত্রশিল্পী ছিলেন যার অঙ্কিত বহু তৈলচিত্র উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে।
গিরিশ চন্দ্র চৌধুরী ছিলেন কবিয়ালদের এক অনন্য পৃষ্ঠপোষক এবং হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট। তিনি সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব ছেড়ে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে কবিয়ালদের সহায়তা করতেন। তিনি জনপ্রিয় কবিয়ালদের নিয়ে আসর বসাতেন এবং তাদের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাৎক্ষণিক টপ্পা রচনায় উৎসাহিত করে এই লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
গিরিশচন্দ্র কাব্য-বেদান্ততীর্থ ছিলেন একজন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত ও গবেষক। তিনি রাজশাহী হেমন্তকুমারী সংস্কৃত কলেজে দীর্ঘ ২৭ বছর অধ্যাপনা করেন এবং প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতি ও তন্ত্রশাস্ত্রের ওপর বহু গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজ ‘প্রাচীন শিল্প-পরিচয়’ এবং তন্ত্রের ইতিহাস বাংলা সাহিত্যে উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে।
আকামু গিয়াস উদ্দিন মিল্কী ছিলেন একজন জাতীয় পদকপ্রাপ্ত সফল কৃষিবিদ এবং সমাজসেবক। তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং কৃষি ক্ষেত্রে নতুন ধারণা উদ্ভাবনের জন্য দুইবার ‘প্রেসিডেন্ট পদক’ লাভ করেন। তিনি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের সহ-সভাপতি হিসেবে কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
গুরুদয়াল অধিকারী ছিলেন টংক ও ব্রিটিশবিরোধী কৃষক আন্দোলনের এক নীরব কিন্তু বলিষ্ঠ সমর্থক। তিনি হাজং সম্প্রদায়ের একজন পুরোহিত ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার সমস্ত জমি ও সম্পত্তি কমিউনিস্ট পার্টিকে দান করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তার এই মহান ত্যাগ এ অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনে গভীর শক্তি জুগিয়েছিল।
গুল মাহমুদ ছিলেন বেদে সম্প্রদায়ের একজন বিশিষ্ট বাউল শিল্পী। তিনি বাউল গানকে জীবনের প্রধান অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনার নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলনে গান গেয়ে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। মালেজোড়া বাউল গানে তার পারদর্শিতা এ অঞ্চলের লোকসঙ্গীতকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।
গোরাচাঁদ হাজং ছিলেন সুসঙ্গ জমিদারদের শোষণ ও দীর্ঘদিনের পরাধীনতার বিরুদ্ধে হাজং প্রজাদের সশস্ত্র সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতা। ১৮৯০ সালে তিনি জমিদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়, এবং তার পরবর্তী জীবন ইতিহাসের এক অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
গোলাম এরশাদুর রহমান ছিলেন নেত্রকোনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির একনিষ্ঠ সংগ্রাহক ও গবেষক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তার রচিত ‘নেত্রকোনার বাউল গীতি’ এবং ‘মুক্তি সংগ্রামে নেত্রকোনা’ গ্রন্থগুলো এ অঞ্চলের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ। তিনি আমৃত্যু লোকসংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা চর্চার সাথে যুক্ত ছিলেন।
তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী এবং নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রণী কর্মী। স্বাধীনতা পূর্বকাল থেকেই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। নিয়মিত প্রবন্ধ ও গল্প রচনার মাধ্যমে তিনি নেত্রকোণার সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করছেন। সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবদান এবং সাহিত্যিকদের একত্রিত করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তিনি একজন বিশিষ্ট শল্য চিকিৎসক (ইউরোলজিস্ট) এবং বিজ্ঞান লেখক। বুলগেরিয়া থেকে পিএইচডি করা এই চিকিৎসকের 'জীবন ও মানুষ' গ্রন্থটি সমাদৃত। বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ বাংলায় লেখনীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরায় তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছেন।
গোলাম মোস্তফা ছিলেন একজন প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদ। তিনি দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন এবং ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ন্যাপ (ভাষানী) ও গণতান্ত্রিক পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
তিনি বর্তমান সময়ের নেত্রকোণার অন্যতম জনপ্রিয় বাউল শিল্পী। তাঁর প্রকাশিত ২৫টিরও অধিক অডিও-ভিডিও অ্যালবাম লোকসংগীত পিপাসুদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বর্তমানে তিনি টেলিভিশন ও মঞ্চের একজন নিয়মিত শিল্পী। লোকসংগীতের শুদ্ধ চর্চা ও প্রসারে নেত্রকোণার তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে তিনি অন্যতম পথপ্রদর্শক।
তিনি নেত্রকোনা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ এবং সাহিত্যিক। ধ্রুপদী অনুবাদ এবং প্রগতিশীল সাহিত্য চর্চায় তার অবদান অনন্য। তিনি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় গ্রন্থের অনুবাদক হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও অনুবাদক হিসেবে তিনি 'আল-মুকাদ্দিমা' ও 'কালিলা ও দিমনা' অনুবাদ করেন। তিনি ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যাপক ছিলেন এবং ২০১৭ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।
ওস্তাদ গৌরাঙ্গ চন্দ্র আদিত্য ছিলেন বাংলাদেশের যাত্রা শিল্পের প্রবীণতম শিল্পী এবং ‘বিবেক’ চরিত্রের কিংবদন্তি। তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় মঞ্চে বিবেকের গান গেয়ে অগণিত মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। যাত্রাশিল্পে অবদানের জন্য তিনি জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
গয়ানাথ ঘোষ ছিলেন বিখ্যাত ‘বালিশ মিষ্টি’র উদ্ভাবক। তিনি নেত্রকোনা শহরে ‘গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ প্রতিষ্ঠা করেন। গতানুগতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি নতুন স্বাদের ও বিশাল আকারের বালিশ মিষ্টি তৈরি করে দেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। এই মিষ্টি আজও নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী ও অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে স্বীকৃত।
চণ্ডিপ্রসাদ ঘোষ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের একজন প্রখ্যাত কবিয়াল ছিলেন। তিনি নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া উপজেলার তারাচাপুর গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন সময়ে টপ্পার আসরে তার গায়কী এবং কবিগান পরিবেশনা স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এবং তিনি লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন।
চন্দ্রকুমার দে বিশ্বখ্যাত 'মৈমনসিংহ গীতিকা'র অমর সংগ্রাহক। অতি দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠেও তিনি নেত্রকোণার গ্রাম-গ্রামান্তর ঘুরে বিলুপ্তপ্রায় পালাগানগুলো সংগ্রহ করেন। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সহায়তায় তার সংগৃহীত এই অমূল্য সম্পদগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, যা বাংলা লোকসাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।
চান খাঁ পাঠান নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত বাউল সাধক ও তাত্ত্বিক ছিলেন। তিনি মালেজোড়া বাউল গানকে জনপ্রিয় করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তার রচিত গানে প্রকৃতি ও মানবপ্রেমের গভীর ভাবধারা ফুটে উঠেছে। তিনি সুফিবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন এবং আজীবন বাউল সাধনার মাধ্যমে লোকসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।
বাউলরাজ চান মিয়া নেত্রকোণা অঞ্চলের অত্যন্ত জনপ্রিয় বাউল শিল্পী ছিলেন। তিনি প্রথম নির্ধারিত সম্মানীর বিনিময়ে মালেজোড়া বাউলগান গাওয়ার প্রথা শুরু করেন। তার সুমধুর কণ্ঠ ও সহজ-সরল আঞ্চলিক ভাষায় রচিত গানগুলো সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীর স্থান করে নেয়। তিনি 'সুরেশ্বরী চাঁন গীতিকা' নামক গ্রন্থের রচয়িতা।
চারুচন্দ্র অধিকারী ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন নিবেদিতপ্রাণ বিপ্লবী ছিলেন। অগ্নিযুগের এই যোদ্ধা অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য হিসেবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি ব্রিটিশ রাজের কারাগারে দীর্ঘ ১২ বছর বন্দি জীবন অতিবাহিত করেন এবং অসামান্য দেশপ্রেমের নজির স্থাপন করে গেছেন।
ছত্তার পাগলা ছিলেন এক স্বতন্ত্র ধারার মরমী বাউল চারণকবি। তিনি নিজস্ব আঞ্চলিক শব্দ ও উচ্চারণে কঠিন বিষয়কে গানের মাধ্যমে তুলে ধরতেন। খঞ্জরি বাজিয়ে হাটে-বাজারে ঘুরে বেড়ানো এই কবির গানগুলো জীবন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ছিল। তার অনন্য প্রতিভা এবং লোকজ ধারার গায়কী নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতিতে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
ছপাতি শাহ ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী পাগলপন্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। তিনি সাম্যবাদী সুফী সাধক হযরত করম শাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তিনি গারো পাহাড় অঞ্চলের আদিবাসীদের সংগঠিত করে অত্যাচারী জমিদার এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। মানুষের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ প্রচারে তার অবদান অনস্বীকার্য।
ছাডু নাথ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের একজন প্রখ্যাত কবিয়াল ছিলেন। তিনি নেত্রকোণার সেতরশ্রী গ্রামে বসবাস করতেন এবং তৎকালীন টপ্পার আসরে তার বিশেষ খ্যাতি ছিল। কবিগানের প্রাচীন ধারায় তার পদচারণা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। তিনি স্থানীয় লোকসংস্কৃতির বিকাশে এবং কবিগানের চর্চাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
তিনি নেত্রকোণা লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর রচিত 'নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা' গানটি অমর হয়ে আছে। তিনি ৩০০-এর বেশি জনপ্রিয় লোকসংগীতের রচয়িতা। এই নারী কবি নেত্রকোণার মরমী সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে লোকজ গান বিশ্বদরবারে পরিচিতি লাভ করেছে।
তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে তিনি ময়মনসিংহের 'শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক' নির্বাচিত হয়েছেন। পরিসংখ্যান ও শিক্ষা গবেষণায় তাঁর পাণ্ডিত্য স্বীকৃত। তিনি বিভিন্ন ম্যাগাজিনে নিয়মিত শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারমূলক প্রবন্ধ লিখে নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহের শিক্ষা প্রসারে অবদান রাখছেন।
জগ ছিলেন উনিশ শতকের গারো অঞ্চলের একজন অকুতোভয় আদিবাসী সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। সুসঙ্গ এলাকায় জমিদার বাহিনীর শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে পরিচালিত 'হাতীখেদা' বিদ্রোহে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই সশস্ত্র সংগ্রামে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন, যা নেত্রকোণার আদিবাসী আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা।
জগদীশ চন্দ্র দত্ত একাধারে একজন দক্ষ অভিনেতা, পরিচালক এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সংগ্রামী ছিলেন। তিনি নেতাজী সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের হোমগার্ড ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করেছেন। অভিনয় জগতে তার বিশেষ খ্যাতি ছিল এবং তিনি নিজস্ব নাট্যদল গঠন করে নেত্রকোণার নাট্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন শিক্ষক ও চিকিৎসক ছিলেন।
জগৎমণি সিংহ ছিলেন নেত্রকোণার পূর্বধলার রাজা হরচন্দ্র সিংহের সহধর্মিণী এবং এক উদার সমাজহিতৈষী নারী। শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯১৬ সালে তার আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্বধলার বিখ্যাত 'জগৎমণি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠিত হয়। তার বদান্যতা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড আজও অত্র অঞ্চলের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে আছে।
জমশেদ উদ্দিন ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট বাউল সাধক। তিনি বেদে সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েও তাত্ত্বিক বাউল হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৪৫ সালে নেত্রকোণার ঐতিহাসিক নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলনে বাউলগান পরিবেশন করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। আমৃত্যু বাউল সাধনায় মগ্ন থেকে তিনি নেত্রকোণার মরমী সঙ্গীত ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তিনি নেত্রকোণার একজন প্রতিষ্ঠিত তরুণ লেখক এবং উদীচীর সক্রিয় নেত্রী। তাঁর উপন্যাস 'অম্বা আখ্যান' সাহিত্যাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তিনি একাধিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি সামাজিক গবেষণায়ও পারদর্শী। তাঁর লেখনীতে নারীর জীবন ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ফুটে ওঠে।
জহুর উদ্দিন মাস্টার ছিলেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম কাণ্ডারি। তিনি মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং টংক প্রথা বিরোধী সংগ্রামে তিনি মণি সিংহের সহযোগী হিসেবে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। অসাধারণ বাগ্মী হিসেবে তিনি কৃষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন।
মো. জহুর উদ্দিন ছিলেন বাউলগানের একজন বিশেষজ্ঞ তাত্ত্বিক ও শিল্পী। তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলে জারি ও সারি গানের বয়াতী হিসেবে অত্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত তিনি লোকসঙ্গীতের আসরগুলোতে সপ্রতিভ ছিলেন। তার সঙ্গীতশৈলী এবং তত্ত্বজ্ঞান অত্র অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতি ও বাউল ঘরানাকে সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মুন্সী শা জহুর উদ্দীন ছিলেন নেত্রকোণার একজন পুঁথি লেখক, যিনি বিখ্যাত সুফী সাধক শাহ কামালের বংশধর ছিলেন। তার রচিত পুঁথি 'বংশনামা' অত্র অঞ্চলের ইতিহাস ও বংশীয় ইতিবৃত্তের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জন্মগ্রহণকারী এই লেখক তার লেখনীর মাধ্যমে লোকসাাহিত্যে নিজস্ব ছাপ রেখে গেছেন এবং ইসলামী ইতিহাস সংরক্ষণে অবদান রেখেছেন।
জানকুপাথর ও দোবরাজপাথর ছিলেন গারো ও হাজং কৃষকদের বিদ্রোহের বীর নায়ক। ১৮২৪ ও ১৮৩৩ সালের সশস্ত্র বিদ্রোহে তারা পাগলপন্থী নেতা টিপু পাগলার আদর্শে ব্রিটিশ শাসক ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তাদের নেতৃত্বে হাজার হাজার কৃষক তরবারি ও গাদাবন্দুক নিয়ে ব্রিটিশ বাহিনীর মোকাবেলা করেছিল। তাদের সংগ্রামের স্মৃতি আজও অত্র অঞ্চলের ইতিহাসে অম্লান।
তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিশোর সাহিত্যিক এবং বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। কলামিস্ট হিসেবে তাঁর লেখনী তরুণ সমাজকে প্রভাবিত করেছে। 'দীপু নাম্বার টু' তাঁর অমর সৃষ্টি। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে ও বিজ্ঞানের প্রসারে অবদানের জন্য তিনি অসংখ্য জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত।
তিনি নেত্রকোণা ও মোহনগঞ্জের আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষণায় বিশেষ অবদান রেখেছেন। তাঁর প্রকাশিত 'मोहनগঞ্জের ইতিকথা' গ্রন্থটি অঞ্চলের ইতিহাস চর্চায় অত্যন্ত মূল্যবান। তিনি আশির দশক থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত গবেষণা প্রবন্ধ লিখে আসছেন। লোকজ ইতিহাস ও আন্দোলনের তথ্য সংগ্রহে তাঁর নিরলস পরিশ্রম ও নিষ্ঠা প্রশংসিত।
বাউল সম্রাট জালাল উদ্দিন খাঁ ছিলেন বাংলা লোকসঙ্গীতের এক কিংবদন্তি পুরুষ। তিনি হাজার হাজার মরমী গান রচনা করেছেন যা 'জালাল গীতিকা' নামে সংকলিত হয়েছে। তার গানে আধ্যাত্মবাদ ও মানবতা ফুটে উঠেছে। তিনি নেত্রকোণার বাউল ধারায় মালেজোড়া গানের অন্যতম প্রধান নির্মাতা ছিলেন। তার সৃষ্টি আজও বাংলার বাউল ও লোকসঙ্গীত প্রেমীদের কাছে ধ্রুবতারার মতো সত্য।
মো. জালাল উদ্দিন তালুকদার ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা। ১৯৭১ সালে তিনি ১১ নং সেক্টরের প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি দুর্গাপুর-কলমাকান্দা আসন থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পেশাগত জীবনের বাইরেও তিনি এলাকায় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক উন্নয়নে আজীবন কাজ করে গেছেন।
জিতারী ছিলেন চতুর্দশ শতকের একজন স্বাধীনচেতা ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসী এবং সামন্ত শাসক। তিনি নেত্রকোণার খালিয়াজুরি অঞ্চলে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জিতারীই সর্বপ্রথম অত্র অঞ্চলকে কামরূপের শাসন থেকে মুক্ত করে স্থানীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্যযুগের শুরুতে নেত্রকোণার ভাটি অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত।
জিতেন সেন ছিলেন বিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের একজন প্রথিতযশা সঙ্গীতশিল্পী। তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে এবং সেতার বাদনে অসামান্য পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। বিখ্যাত ওস্তাদ এনায়েত খাঁর কাছে তালিম নেওয়া এই শিল্পী নেত্রকোণার 'ব্রজেন্দ্র কিশোর সংগীত সমাজ'-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তৎকালীন সময়ে তিনি নেত্রকোণার মার্গীয় সঙ্গীত চর্চার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি একজন প্রবীণ সাংবাদিক এবং 'সাপ্তাহিক ছুটি'র সাবেক সম্পাদক। নেত্রকোণা নিয়ে তাঁর রচিত গানটি জেলায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। শৈশব থেকেই সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত থেকে তিনি একাধিক বই প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে এক শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
এম জুবেদ আলী ছিলেন নেত্রকোণার একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট আইনজীবী এবং চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ভারতের তুরায় শরণার্থী শিবিরের ত্রাণ কার্য পরিচালনা করেন। তিনি নেত্রকোণা ও কেন্দুয়া এলাকায় একাধিক কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখেছেন।
জ্ঞানচন্দ্র মজুমদার ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক কিংবদন্তি বিপ্লবী। তিনি অনুশীলন সমিতির প্রথম সারির সদস্য ছিলেন এবং ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবে সাহসী ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ ২৬ বছর তিনি কারান্তরালে কাটিয়েছেন। ১৯৩৮ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। আমৃত্যু দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এই নেতা ময়মনসিংহ জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবেও দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেন।
জ্যোতিশচন্দ্র জোয়ারদার ছিলেন একজন প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী ও রাজনীতিবিদ। ছাত্রজীবনেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে একাধিকবার কারাবরণ করেন। তিনি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লক দলের শীর্ষ নেতা ছিলেন। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়েও তিনি গণমানুষের অধিকারের জন্য আন্দোলন করেছেন এবং তার সংগ্রামী জীবন নিয়ে 'আত্মজীবনী' গ্রন্থ রচনা করেছেন।
টিপু শাহ ছিলেন বিখ্যাত পাগলপন্থী বিদ্রোহের প্রধান নেতা। তিনি ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারদের অন্যায্য খাজনা ও শোষণের বিরুদ্ধে বিশাল কৃষক বাহিনী গঠন করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি শেরপুর অঞ্চলে এক স্বাধীন শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন যা দুই বছর স্থায়ী ছিল। ব্রিটিশ বিরোধী এই মহান সংগ্রামী দীর্ঘকাল কারাবাস করেন এবং কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি একজন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ছিলেন এবং অভিনেত্রী জয়া বচ্চনের পিতা। তার বিখ্যাত উপন্যাস 'বেহড়বাগী বন্দুক' এবং 'অভিশপ্ত চম্বল' পাঠক মহলে অত্যন্ত পরিচিত।
বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক এবং অভিনেত্রী জয়া বচ্চনের পিতা। তার বিখ্যাত উপন্যাস 'বেহড়বাগী বন্দুক' ভারতের চম্বল এলাকার ডাকাতদের জীবন নিয়ে রচিত। বাংলা সাহিত্যে তিনি একজন শক্তিমান লেখক হিসেবে সুপরিচিত।
তিনি একজন সৃজনশীল ব্যবসায়ী এবং চলচ্চিত্র জগতের সাথে জড়িত ব্যক্তিত্ব। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তিনি প্রতিভার পরিচয় দেন এবং 'বাচসাস পুরস্কার' লাভ করেন। তিনি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান 'গ্রীণবাংলা'র প্রতিষ্ঠাতা। নেত্রকোণা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ও সক্রিয় সম্পৃক্ততা শিল্পচর্চাকে গতিশীল করতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
তিনি নেত্রকোণার এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত। পেশায় রিকশাচালক হলেও উপার্জনের বড় অংশ তিনি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ কিনতে ব্যয় করেন। দুর্গাপুরের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি দীর্ঘ বছর ধরে এই সহায়তা দিয়ে আসছেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ সমাজসেবা জাতীয়ভাবে প্রশংসিত হয়েছে এবং বহু সম্মাননা এনে দিয়েছে।
তারাচাঁদ ছিলেন উনিশ শতকের প্রখ্যাত এক অন্ধ কবিয়াল। যৌবনে বসন্ত রোগে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও তিনি কবিগানের চর্চায় অসামান্য সাফল্য অর্জন করেন। তৎকালীন জমিদার সূর্যকান্ত চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি লোকজ সংস্কৃতির এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেন। তার রচিত গানগুলোতে সমকালীন সমাজ ও কৃষকদের দুর্দশার কথা ফুটে উঠেছে। তিনি উপস্থিত বুদ্ধিতে তাৎক্ষণিক কবিগান রচনায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন।
তৈয়ব আলী ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের মালেজোড়া বাউল গানের অন্যতম প্রধান শিল্পী ও সাধক। শৈশবে দৃষ্টিশক্তি হারালেও তিনি বাউল রশীদ উদ্দিনের সান্নিধ্যে এসে বাউল তত্ত্বে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি অসংখ্য মরমী গান রচনা করেছেন যা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। লোকসংস্কৃতিতে তার অবদান এবং বাউল গানের প্রসারে তার ভূমিকা আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়।
তিনি ১১ নং সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন গারো বীর যোদ্ধা। বিজয়পুর পাকবাহিনী ক্যাম্প আক্রমণে তিনি বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধের পর তিনি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন। নেত্রকোণা অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার যুদ্ধে তাঁর অবদান অপরিসীম ও স্মরণীয়।
দবির উদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা এবং কৃতী ফুটবলার। ঢাকা ব্রাদার্স ইউনিয়নের এই খেলোয়াড় ১৯৭১ সালে ভারতের বাঘমারা ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২০ অক্টোবর তিনি পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন এবং অমানুষিক নির্যাতনের পর ২২ অক্টোবর তাকে নেত্রকোণার চল্লিশা রেল সেতুর নিচে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার স্মৃতিতে মোহনগঞ্জে রাস্তা নামাকরণ হয়েছে।
তিনি একাধারে একজন নাট্যশিল্পী ও দক্ষ ক্রিকেটার। ময়মনসিংহের 'বহুরূপী' নাট্যসংস্থা ও উদীচীর সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে নাট্যচর্চা করছেন। তিনি ময়মনসিংহ জেলা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি জগতের সমন্বয়কারী হিসেবে কেন্দুয়া ও নেত্রকোণা অঞ্চলে তাঁর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
দুঃখীরা গায়েন ছিলেন বিশ শতকের প্রথমার্ধের এক বিখ্যাত লোক গায়েন। তিনি নেত্রকোণা ও পূর্বধলা অঞ্চলে গীত গাওয়ার জন্য অত্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন। এক নাগাড়ে দীর্ঘ সাত দিন ব্যাপী আসরে গীত পরিবেশন করার অনন্য ক্ষমতা তার ছিল। গ্রামীণ জনপদে লোকসংস্কৃতির ধারা বজায় রাখতে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ১৯৪৪ সালে এই গুণী লোকশিল্পী মৃত্যুবরণ করেন।
দুর্গেশচন্দ্র পত্রনবীশ ছিলেন একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও সাংবাদিক। তিনি ১৯৪০ সালে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দেন এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য কারাবরণ করেন। তিনি নেত্রকোণা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এবং 'জনতা' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তার রচিত উপন্যাস 'মীরা মিত্র' সিদ্ধার্থ মৈত্র ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জাতীয় পার্টির রাজনীতিবিদ। তিনি নেত্রকোণা-৫ আসন থেকে ১৯৮৬ সালে তৃতীয় এবং ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
দেবদাস জোয়ারদার ছিলেন একজন প্রথিতযশা অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক। তিনি কলকাতার মাওলানা আজাদ কলেজে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন। রবীন্দ্র সাহিত্যে তার গভীর পাণ্ডিত্য ছিল এবং তিনি রবীন্দ্রচর্চা ভবনের শিক্ষক ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থ 'তোমার সৃষ্টির পথে' এবং 'রবীন্দ্রনাথের চিত্রা' পাঠক ও গবেষক মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। লোকজ ও ধ্রুপদী সাহিত্য চর্চায় তার অবদান চিরস্মরণীয়।
দ্বিজ কানাই ছিলেন মধ্যযুগের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী লোককবি। তিনি বিশ্বখ্যাত 'মহুয়া' ও 'নদের চাঁদ' পালার রচয়িতা হিসেবে অমর হয়ে আছেন। তার রচিত পালাগানগুলোতে প্রেমের মানবিক রূপ ও সমাজের চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। নেত্রকোণা অঞ্চলের লোকজ সাহিত্যের ইতিহাস তার সৃষ্টির কাছে চিরঋণী। ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাকে সপ্তদশ শতকের কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অন্ধকবি দ্বীন শরৎ ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের এক কালজয়ী বাউল সাধক। শৈশবে দৃষ্টিশক্তি হারালেও তিনি অন্তরের আলো দিয়ে সহস্রাধিক মরমী গান রচনা করেছেন। নলিনীরঞ্জন সরকারের সহযোগিতায় তিনি লোকসঙ্গীত জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তার রচিত গানে মনুষ্যত্ব ও আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা অত্যন্ত প্রবল। 'বাউল সংগীত' ও 'এছলাম সংগীত' তার রচিত দুটি অমূল্য গানের সংকলন।
ধনু সাত্তার ছিলেন বিশ শতকের একজন নিভৃতচারী লোককবি এবং বাউল শিল্পী। তিনি নেত্রকোণা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাউল গানের চর্চা ও প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। লোকজ সংস্কৃতির প্রচার ও সাধারণ মানুষের মাঝে বাউল দর্শনের সারকথা পৌঁছে দেওয়াই ছিল তার প্রধান ব্রত। তার সৃষ্টির অনেক কিছুই সংরক্ষিত না থাকলেও স্থানীয় লোকঐতিহ্যে তার নাম গুরুত্বের সাথে উচ্চারিত হয়।
তিনি ১১ নং সেক্টরের প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দুর্গাপুর ও ধোবাউড়া অঞ্চলে অন্তত ১২টি সফল অপারেশনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে তাঁর সাহস ছিল অভাবনীয়। যুদ্ধের পর তিনি কৃষিকাজে আত্মনিয়োগ করেন। নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে স্বাধীনতার পতাকা উড্ডয়নে তাঁর ভূমিকা চিরস্মরণীয়।
ধীরেন্দ্রনাথ সরকার একজন বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক এবং বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। সারাজীবন তিনি কেন্দুয়ার গোপালাশ্রমে থেকে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছেন। তিনি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ ১২ বছর সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন এবং জনদরদী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তিনি একজন প্রখ্যাত অধ্যাপক এবং সাহিত্যিক। তাঁর প্রকাশিত ২০টি গ্রন্থের মধ্যে 'পদ্মের জন্মকথা' উল্লেখযোগ্য। তিনি নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতি রক্ষায় নিবেদিত এবং 'জনান্তিক নাট্যগোষ্ঠী'র প্রতিষ্ঠাতা। বিভিন্ন সাহিত্যিক সম্মাননায় ভূষিত এই লেখক তাঁর লেখনীর মাধ্যমে নেত্রকোণার ইতিহাস ও নিসর্গকে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং শিক্ষা প্রসারে অবদান রাখছেন।
নাট্যসম্রাট নয়ন মিয়া ছিলেন যাত্রা ও থিয়েটার জগতের এক কিংবদন্তি অভিনেতা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে তার অভিনয় সারা দেশে বিপুল খ্যাতি এনে দিয়েছিল। তার ছিল অসাধারণ দরাজ কণ্ঠস্বর। তিনি কলকাতা ও আসামসহ বিভিন্ন স্থানে পেশাদার যাত্রাদলের সাথে কাজ করেছেন এবং বহু স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতির প্রসারে এবং যাত্রা শিল্পকে মর্যাদাপূর্ণ স্থানে নিতে তার অবদান অনবদ্য।
নরেশ রায় ছিলেন অগ্নিযুগের অকুতোভয় বিপ্লবী এবং মাস্টারদা সূর্যসেনের সহযোগী। ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। অভিযানের চার দিন পর জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে তিনি বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। নেত্রকোণার এই বীর সন্তান দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে অমর হয়ে আছেন।
তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নেত্রকোণা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি। দীর্ঘ চার দশক ধরে তিনি বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত এবং শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে কারাবরণ করা এই নেতা নেত্রকোণা অঞ্চলের সাধারণ মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এক অকুতোভয় সৈনিক।
নলিনীরঞ্জন সরকার ছিলেন অবিভক্ত বাংলার রাজনীতি ও অর্থনীতির এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। তিনি কলকাতার মেয়র, ব্রিটিশ ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি নেত্রকোণা শহরে 'চন্দ্রনাথ হাইস্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষা এবং শিল্পোন্নয়নে তার ভূমিকা ছিল অসামান্য। তিনি তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত 'বিগ ফাইভ'-এর অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ী এই শিল্পী অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন। তিনি টানা সাতবার 'মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার' লাভ করেছেন। নেত্রকোণা জেলার সংগীত ঐতিহ্যের আধুনিক ধারায় তিনি অন্যতম এক পথিকৃৎ এবং দেশের সংগীত জগতের এক গর্বিত সন্তান।
তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং একজন মননশীল গবেষক। জসীমউদ্দীনের গদ্য ও বাংলা সাহিত্যের বিবিধ বিষয় নিয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ উচ্চ মহলে প্রশংসিত। নেত্রকোণার সন্তান হিসেবে তিনি জাতীয় পর্যায়ে ইতিহাস ও সাহিত্যের মৌলিক গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক অবদান রাখছেন।
তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় কবি। 'হুলিয়া' কবিতার মাধ্যমে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত লেখক। নেত্রকোণার মালনী এলাকায় তিনি 'কবিতাকৃষ্ণ' প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর আপসহীন লেখনী ও অসামান্য জীবনবোধ তাঁকে এদেশের এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত বাউল শিল্পী। ওস্তাদ ইসরাইল মিয়ার কাছে তালিম নিয়ে তিনি বাউল সংগীতে দক্ষ হয়ে ওঠেন। তিনি মূলত জালাল গীতির একনিষ্ঠ সাধক। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর রচিত গানের সংকলন ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। আজও তিনি গ্রামীণ জনপদে বাউল গান গেয়ে মরমী চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
নুরুজ্জামান শেখ ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন প্রথিতযশা প্রযোজক এবং জনপ্রিয় গীতিকার। তার রচিত 'ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে' এবং 'এই দুনিয়া এখনতো আর সেই দুনিয়া নয়' গানগুলো বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন এবং তার সৃষ্টিশীল লেখনীর মাধ্যমে বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার অকাল মৃত্যু দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বড় শূন্যতা তৈরি করে।
সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিনি বিএনপি’র টিকিটে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি ছেড়ে তিনি ব্যবসায় সফল হন এবং নিজ এলাকায় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং নেত্রকোণা-৩ আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৭১ সালে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং রেইনবো গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন।
তিনি একাধারে সাংবাদিক, গীতিকার এবং লায়ন্স ক্লাবের সাবেক সভাপতি। সাপ্তাহিক 'চিন্তাভাবনা' পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। সামাজিক উন্নয়ন ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি গীত রচনার ক্ষেত্রেও প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। নেত্রকোণা জেলা ও ঢাকার সাংবাদিক সমাজে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত সক্রিয় ও সম্মানজনক।
এন আই খান ছিলেন নেত্রকোণার একজন প্রভাবশালী জননেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। তিনি নেত্রকোণা পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ নেত্রকোণায় তিনি সর্বপ্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। তিনি ভারত সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সারাজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অটল এই নেতা জনসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মো. নুরুল ইসলাম একজন প্রগতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাংস্কৃতিক কর্মী। তিনি 'বীরাঙ্গনা সখিনা' নাটকের রচয়িতা হিসেবে সাহিত্য সমাজে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার রচিত 'নুরুলগীতি' গ্রন্থটি লোকসঙ্গীতের এক অনন্য উদাহরণ। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবার মাধ্যমে তিনি নেত্রকোণার লোকজ ঐতিহ্যকে ধারণ ও বিকাশে অবদান রেখে চলেছেন।
এস এম নুরুল হোসেন কাশিমপুরী ছিলেন একাধারে একজন ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং প্রভাবশালী সাংবাদিক। তিনি 'হানাফি', 'নবনূর' ও 'দেশের ডাক'সহ চারটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি ৩৬টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে ইতিহাস ও জীবনী প্রধান। মুসলিম জাতির ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে তার দীর্ঘ গবেষণাকর্ম আজও অত্যন্ত মূল্যবান। তিনি তৎকালীন ময়মনসিংহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাগ্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন কিংবদন্তি ফুটবলার এবং ক্রীড়া সংগঠক। ষাটের দশকে জেলা দলের হয়ে বহু টুর্নামেন্টে কৃতি স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি 'কংস থিয়েটার'-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। নেত্রকোণা জেলার ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রসারে তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবন অত্যন্ত গৌরবময় এবং নতুন খেলোয়াড়দের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।
নূরুল হোসেন খন্দকার ছিলেন একজন বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক এবং রাজনীতিবিদ। তিনি বারহাট্টা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তার রচিত 'শাহ সুলতান রুমী (রহ.)' এবং 'নাস্তিকতাবাদ ও নৈতিকতা' গ্রন্থগুলো ইসলামী দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।
পচু সরকার ছিলেন উনিশ শতকের অনগ্রসর মুসলিম সমাজের এক অকুতোভয় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি গৌরীপুরের অত্যাচারী জমিদারের প্রজা পীড়ন ও অন্যায্য খাজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। জমিদারের ষড়যন্ত্র এবং হত্যার চক্রান্ত নস্যাৎ করে তিনি কৃষকদের মাঝে প্রতিরোধের শক্তি সঞ্চার করেন। তার এই সংগ্রামী ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।
তিনি বর্তমানে 'প্রথম আলো'র নেত্রকোণা প্রতিনিধি এবং কলেজের প্রভাষক। নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতি ও একাত্তরের শহীদদের জীবন নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক প্রতিবেদন জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে। তিনি 'পিদিম' নামক সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন। নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ ও উদীচীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত সক্রিয়।
পিতাম্বর রবিদাস ছিলেন বিশ শতকের নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রথিতযশা বাউল শিল্পী। তিনি বাউল সম্রাট রশীদ উদ্দিনের সহকর্মী হিসেবে বাউল তত্ত্ব ও সঙ্গীতের প্রসারে কাজ করেছেন। জালাল উদ্দিন খাঁর সমসাময়িক এই শিল্পী লোকজ সুরের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চিন্তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতেন। নেত্রকোণা বাউল ঘরানার বিকাশে তার অবদান ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন। ১১ নং সেক্টরের অধীনে ধোবাউড়া ও দুর্গাপুর অঞ্চলে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করেন। যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শ্রমজীবী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই যোদ্ধার আত্মত্যাগ নেত্রকোণার স্বাধীনতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী। নজরুল সংগীত ও লোকসংগীতে তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা রয়েছে। সংগীতের মাধ্যমে নেত্রকোণার কৃষ্টিকে জাতীয়ভাবে তুলে ধরায় তিনি সুপরিচিত কণ্ঠ। বর্তমানে তিনি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে নতুন প্রজন্মকে সংগীতে উৎসাহিত করছেন এবং সাংস্কৃতিক বিকাশে ভূমিকা রাখছেন।
পুষ্প রঞ্জন আচার্য ছিলেন নেত্রকোণার এক নিভৃতচারী মহান শিল্পী। তিনি মাটি ও রঙের বদলে নিজস্ব উদ্ভাবিত টেকসই উপাদানে নান্দনিক ভাস্কর্য তৈরি করতেন। তার শিল্পকর্মে মুক্তিযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং গ্রামীণ জীবন অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটে উঠত। দীর্ঘ ৫০ বছর সাধনা করে তিনি শতাধিক ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন, যার কয়েকটি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত। অবহেলিত এই শিল্পীর কাজের মাধ্যমে লোকজ ঐতিহ্যের আধুনিক রূপায়ণ ঘটেছে।
তিনি একজন কৃতি চিকিৎসক এবং প্রতিভাবান কবি। ক্যান্সার গবেষণায় স্নাতকোত্তর করা এই ব্যক্তিত্ব সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নেত্রকোণা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তিনি আবৃত্তি ও নৃত্যের সাথে জড়িত থেকে সাংস্কৃতিক বিবর্তনে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন।
পূর্ণ চক্রবর্তী ছিলেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন দক্ষ সংগঠক। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে অনুশীলন সমিতির সদস্য হিসেবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে এই বীর বিপ্লবী মৃত্যুবরণ করলেও তার সাহসী অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
পূণানন্দ গিরি ছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীর একজন বিশ্ববিখ্যাত সাধক এবং তন্ত্রশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ। তিনি কাটিহালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে কামাখ্যা পীঠ উদ্ধার করে আধ্যাত্মিক জগতে বিশেষ স্থান করে নেন। তিনি 'শ্রীতত্ত্ব চিন্তামণি' এবং 'শ্যামারহস্য' সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সাধন গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার বংশধরেরা পরবর্তীকালে নেত্রকোণা অঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে বিশাল অবদান রেখেছেন।
তিনি দুই বাংলার একজন প্রখ্যাত ছড়াকার এবং একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক ছিলেন। ছন্দের জাদুকর হিসেবে খ্যাত এই লেখক অসংখ্য শিশুতোষ ও গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন। ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা অঞ্চলের সাহিত্য আন্দোলনের তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বাংলা ছড়াসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ।
প্রতুল ভট্টাচার্য ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অকুতোভয় বিপ্লবী এবং অগ্নিযুগের যোদ্ধা। তিনি যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত থেকে দীর্ঘ ১০ বছর কারাবাস করেন। ১৯২৮ সালে সুভাষ চন্দ্র বসুর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। আমৃত্যু কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী এই ত্যাগী পুরুষ বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে নিবেদিত ছিলেন।
প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ছিলেন একজন তুখোড় সাংবাদিক। তিনি 'পাকিস্তান অবজারভার' এবং দিল্লির 'দি টাইমস' পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে থেকে সাংবাদিকতার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে জনমত গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৭ সালে দিল্লিতে অবস্থানকালে অকালেই এই মেধাবী সাংবাদিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
জন্মান্ধ বাউল প্রভাত সূত্রধর ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের এক অনন্য সুরের জাদুকর। অতি দারিদ্র্য ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি বাউল রশীদ উদ্দিন ও জালাল খাঁর সান্নিধ্যে সঙ্গীত সাধনা করেন। তার সুমধুর কণ্ঠ ও একতারা বাদন তাকে লোকসঙ্গীত জগতে উচ্চ আসনে আসীন করেছে। বিশেষ করে অন্ধ কবি দ্বীন শরতের গান পরিবেশনায় তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। লোকসংস্কৃতির একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে তিনি অমর হয়ে আছেন।
সাবেক সমাজকল্যাণ ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। তিনি গারো সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য। মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী শিবিরের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সারাজীবন কাজ করেছেন।
তিনি অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী হওয়া বাংলাদেশের প্রথম গারো ব্যক্তি। পেশায় নার্স হিসেবে দীর্ঘকাল মানুষের সেবা করেছেন। তিনি ৮টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা প্রবাসে গারো সম্প্রদায়ের জন্য এক বিশেষ অনুপ্রেরণা। তিনি নেত্রকোণার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বিদেশের মাটিতে সার্থকভাবে বহন ও প্রচার করে চলেছেন।
পূর্বধলার জমিদার পরিবারের সদস্য প্রসন্নচন্দ্র সিংহ জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তার রচিত 'জাতকবিজ্ঞান' একটি অনন্য গ্রন্থ, যা প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হলেও কাব্যের ভাষায় লিখিত ছিল। তার এই মৌলিক কাজ তাকে স্থানীয় সুধীসমাজে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। লোকায়ত বিজ্ঞান ও সাহিত্যের সংমিশ্রণে তার এই অবদান নেত্রকোণার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়।
ফকির আশরাফ ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি 'দৈনিক ইত্তেফাক' ও 'দৈনিক পয়গাম'-এ সাংবাদিকতা করেছেন এবং পরবর্তীতে কাস্টমস কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার রচিত ১২টি গ্রন্থ রয়েছে, যার মধ্যে 'সোনা ডলার টাকা' উল্লেখযোগ্য। বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতির মহাসচিব হিসেবে তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
ফকির চান্দ ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত বাউল সাধক এবং শ্রী চৈতন্য দেবের আদর্শের অনুসারী। তিনি যৌবনের শুরুতেই সংসারের মায়া ত্যাগ করে পরমাত্মার সন্ধানে ঘর ছাড়েন। তার রচিত গানগুলোতে বৈরাগ্য এবং মরমী ভাবধারা অত্যন্ত সরল ও সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে। নেত্রকোণার বাউল সাহিত্যের প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিলেন এই নিভৃতচারী সাধক।
ফজর আলী ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের কমিউনিস্ট আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী। তিনি মণি সিংহের নেতৃত্বে পরিচালিত টংক ও কৃষক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আজীবন শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে লড়াকু এই নেতা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি অত্র অঞ্চলের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারাকে শক্তিশালী করতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।
ড. ফজলুর রহমান খান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষক এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোরে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে তার নিজ বাসভবনে গুলি করে হত্যা করে। তিনি লন্ডনের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। দেশের স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে মরণোত্তর বিভিন্ন সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।
তিনি নেত্রকোণা জেলার একজন বিশিষ্ট বাউল গীতিকার। আশির দশক থেকে তিনি মরমী ও লোকসংগীত রচনা করে আসছেন। তাঁর রচিত গানগুলো গ্রামীণ শিল্পীদের মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয়। নেত্রকোণা অঞ্চলের নিজস্ব বাউল ঐতিহ্য ও সুরধারাকে লেখালিখির মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তিনি সজীব ও সংরক্ষণ করে চলেছেন।
শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের পিতা। ১৯৭১ সালে পিরোজপুরের এসডিপিও থাকাকালে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেন। এই অপরাধে ৫ মে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তিনি একজন বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক এবং ব্যাংকার। ময়মনসিংহ গীতিকা ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গবেষণা জাতীয়ভাবে সমাদৃত। উত্তর-উপনিবেশী দর্শন ও অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। নেত্রকোণার লোকজীবনকে তাত্ত্বিকভাবে বিশ্ব সাহিত্যের আঙ্গিকে তুলে ধরায় তাঁর ভূমিকা অনন্য এবং আধুনিক ইতিহাস চর্চায় সহায়ক।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক। কায়কোবাদ ও মধ্যযুগের সাহিত্য নিয়ে তাঁর গবেষণা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর প্রকাশিত গবেষণা গ্রন্থসমূহ বিদগ্ধ মহলে উচ্চ প্রশংসিত। নেত্রকোণা জেলার কৃতি সন্তান হিসেবে তিনি জাতীয় শিক্ষা ও গবেষণায় সুদীর্ঘকাল ধরে নিরলসভাবে এবং নিষ্ঠার সাথে অবদান রাখছেন।
মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ বাউল ছিলেন একাধারে রণাঙ্গনের যোদ্ধা এবং মরমী শিল্পী। তিনি ১৯৭১ সালে ১১ নং সেক্টরে সাহসের সাথে যুদ্ধ করেন। তার বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামী জীবন নিয়ে উদীচীর প্রযোজনায় 'ফিরোজ ক্যানভাসার' নামক জনপ্রিয় নাটক নির্মিত হয়, যেখানে তিনি নিজেই অভিনয় করেন। লোকসংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি নেত্রকোণা বাউল ঘরানার একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী এবং মরমী কবি। বাউল সাধক উকিল মুন্সীর পুত্রবধূ হিসেবে তিনি এই পরিবারের সংগীত ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর রচিত অসংখ্য জনপ্রিয় বাউল গান নেত্রকোণা ও ভাটি অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ এবং আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ।
১৯৭৫ সালে বিজ্ঞাপন দিয়ে যাত্রা শুরু করে কয়েক দশক ধরে নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে 'রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত' চলচ্চিত্র এবং 'গুলশান এভিনিউ' নাটক অন্যতম।
ড. বজলুর রহমান খান ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রথিতযশা অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ। তিনি লন্ডনের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের ওপর পিএইচডি অর্জন করেন। তার উল্লেখযোগ্য গবেষণাপত্র 'পলিটিক্স ইন বেঙ্গল' ইতিহাস গবেষণায় এক আকর গ্রন্থ। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য মেধাবী ছাত্র তৈরি করেছেন এবং দেশ-বিদেশে ইতিহাস চর্চায় বিশেষ অবদান রেখেছেন।
বদরউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক এবং জনসেবক। তিনি মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অত্র অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল; তিনি মোহনগঞ্জ কলেজ ও বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। তার সামাজিক নিষ্ঠা ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড মোহনগঞ্জবাসীর কাছে তাকে শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করেছে।
শহীদ বদিউজ্জামান মুক্তা ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক ও সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর পাকিস্তানি হানাদাররা তাকে অমানুষিক নির্যাতনের পর নেত্রকোণার মোক্তারপাড়া ব্রিজে হত্যা করে। নির্যাতনের সময় 'জয় বাংলা' স্লোগান দিয়ে তিনি অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেন। তার আত্মত্যাগের স্মৃতিতে মোক্তারপাড়ায় 'স্মৃতি-৭১' ফলক নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি লোকসেবা ও স্বদেশের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।
বাণেশ্বর শর্মাচার্য ছিলেন নেত্রকোণার একজন প্রথিতযশা সঙ্গীতশিল্পী। তিনি ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর সান্নিধ্যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, ঠুংরি ও নজরুল সঙ্গীতের তালিম নেন। ১৯৩৯ সালে উত্তরবঙ্গ সংগীত সম্মেলনে তিনি বিজয়ী হয়ে পুরস্কৃত হন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা ও প্রসারে নেত্রকোণা জেলায় তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার সুললিত কণ্ঠ ও সুগভীর শাস্ত্রীয় জ্ঞান সঙ্গীত পিপাসুদের মুগ্ধ করত।
বারী সিদ্দিকী ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী এবং বিশ্ববিশ্রুত বংশীবাদক। তার গাওয়া 'শুয়া চান পাখি' এবং 'আমার গায়ে যত দুঃখ সয়' গানগুলো প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। ধ্রুপদী সঙ্গীতের সাথে লোকজ সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি এক অনন্য সঙ্গীতধারা তৈরি করেন। হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি দেশব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
বিজয় নারায়ণ আচার্য ছিলেন উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ শিক্ষিত কবিয়ালদের অন্যতম। তিনি কেবল জনপ্রিয় কবিয়ালই ছিলেন না, ময়মনসিংহের কবিগান ও কবিয়ালদের ইতিহাস নিয়ে 'সৌরভ' পত্রিকায় বহু গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন। তার গভীর শাস্ত্রজ্ঞান এবং সমাজ-সচেতন লেখনী লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল। তিনি 'উপদেশ শতকম' ও 'গৌর গীতাবলী'র মতো কালজয়ী কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে অমর হয়ে আছেন।
বিজয় কৃষ্ণ ভট্টাচার্য ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক অনন্য শিল্পী ও শিক্ষক। মুক্তাগাছার জমিদার পরিবারের আশ্রয়ে থেকে তিনি ভারতীয় ওস্তাদদের কাছে ধ্রুপদ ও খেয়াল গানের তালিম নেন। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নিভে যাওয়া প্রদীপ জ্বালাতে তিনি 'বানু সঙ্গীত বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠা করেন। তার হাত ধরেই বৃহত্তর ময়মনসিংহে রাগ সঙ্গীতের পুনর্জাগরণ ঘটেছিল।
তিনি নেত্রকোণা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ এবং একজন মননশীল প্রাবন্ধিক। তাঁর রচিত উপন্যাস 'শরণার্থী-৭১' ও গবেষণা গ্রন্থ পাঠকপ্রিয় হয়েছে। শিক্ষা ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বহু গবেষণাধর্মী লেখা লিখেছেন। নেত্রকোণা জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সাহিত্য চর্চায় তাঁর অবদান অত্যন্ত সক্রিয় এবং জেলার জন্য গর্বের।
বিনয় ভূষণ চৌধুরী ছিলেন অগ্নিযুগের একজন তেজস্বী বিপ্লবী। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি প্রথম কারাবরণ করেন। এরপর একাধিকবার কারান্তরালে থেকেও তিনি তার বিপ্লবী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। জেল থেকে মুক্তির পর তিনি সাম্যবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য রাজনীতি করেন এবং মোহনগঞ্জ অঞ্চলে প্রগতিশীল চেতনার উন্মেষ ঘটান।
বিনোদ দাস বিশ শতকের নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন অসাধারণ যাত্রাশিল্পী ছিলেন। তিনি 'বিনোদ রাণী' নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন কারণ তিনি নারী চরিত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনয় করতেন। বিশেষ করে রাণী চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করত। তিনি নবরঞ্জন, কৃষ্ণাকলি ও সবুজ অপেরাসহ বিভিন্ন বিখ্যাত যাত্রাদলে কাজ করে অত্র অঞ্চলের যাত্রা শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন।
বিপিনচন্দ্র দাস ছিলেন উপমহাদেশের একজন প্রথিতযশা সেতার ও এস্রাজ বাদক। তিনি গৌরীপুরের জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নেন এবং ওস্তাদ এনায়েত খাঁর কাছে সেতার শেখেন। ভারতের বিভিন্ন রাজদরবারে তিনি সেতার বাজিয়ে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। তার শিল্পী জীবনের শেষ দিনগুলো চরম দারিদ্র্যের মধ্যে কাটলেও মার্গীয় সঙ্গীতে তার অবদান অনস্বীকার্য।
তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট ও চিত্রশিল্পী। বর্তমানে তিনি 'দৈনিক কালের কণ্ঠ' পত্রিকায় কর্মরত। ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে তিনি সমাজ ও রাজনীতির অসঙ্গতিগুলোকে সুতীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরেন। তাঁর অসংখ্য একক চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে এবং কার্টুন শিল্পের মাধ্যমে তিনি জাতীয়ভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।
বিপ্লব চক্রবর্তী ছিলেন নেত্রকোণার এক বহুমুখী প্রতিভাধর সংগীত শিল্পী। ১৯৯৯ সালে তিনি 'অন্তরবাজাও' নামে একটি সংগীদল গঠন করে লোক ও আধুনিক গানের চর্চা শুরু করেন। তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান রচনা ও সুর করেছেন। প্রখ্যাত নির্মাতা সেন্টু রায়ের তথ্যচিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রশংসা কুড়ান। নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার সক্রিয় উপস্থিতি এবং সৃজনশীলতা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
তিনি একজন প্রতিভাবান নাট্য অভিনেতা এবং নির্দেশক। বর্তমানে তিনি নেত্রকোণার কৃতি সন্তান শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে নিয়ে গবেষণামূলক কাজে নিয়োজিত। অসংখ্য টিভি নাটক ও বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছেন। নেত্রকোণা ও মোহনগঞ্জে চলচ্চিত্র উৎসব ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করতে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও শিল্পবান্ধব।
বিভা সাংমা ছিলেন গারো সম্প্রদায়ের প্রথম সারির নারী নেত্রী এবং শিক্ষাবিদ। তিনি বিরিশিরিতে তন্তুবায় শিল্পকেন্দ্র ও বহুমুখী মহিলা সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করে নারীদের স্বাবলম্বী করতে কাজ করেছেন। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমির পরিচালিকা হিসেবে তিনি আদিবাসী সংস্কৃতির সংরক্ষণে অসামান্য অবদান রাখেন। তার গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলো গারো ও হাজং সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও সংস্কৃতি তুলে ধরেছে।
বীরেন্দ্র পাল চৌধুরী ছিলেন বিশ শতকের নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন মৌলিক প্রতিভাসম্পন্ন নাট্যকার। তার লেখনীতে রোমান্টিকতা ও সমাজবাস্তবতা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠত। তার উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে 'আজ অভিনয় বন্ধ', 'যোগ বিয়োগ' এবং 'নলদময়ন্তী' অন্যতম। গ্রামীণ নাট্যাঙ্গনে তার সৃষ্টিগুলো দর্শকদের মুগ্ধ করেছে এবং নেত্রকোণার নাট্যসাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
তিনি নেত্রকোণার 'স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি'র প্রতিষ্ঠাতা এবং একজন নিবেদিত মানবাধিকার কর্মী। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্যাতিত নারীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করছেন। সামাজিক সচেতনতা ও নারী স্বাবলম্বীকরণে তাঁর নিরলস পরিশ্রম তাঁকে নেত্রকোণা জেলার নারী জাগরণের এক আইকন হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং ১১ নং সেক্টরের হয়ে যুদ্ধ করেন। নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন রণাঙ্গনে তিনি সাহসের সাথে যুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতার পর সাধারণ শ্রমজীবী হিসেবে জীবন শুরু করেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বীর যোদ্ধা হিসেবে তাঁর আত্মত্যাগ নেত্রকোণার স্বাধীনতার ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়।
বেহারী হাজং ছিলেন উনিশ শতকের সুসঙ্গ অঞ্চলের ঐতিহাসিক 'হাতীখেদা' আন্দোলনের অন্যতম সাহসী নেতা। তিনি জমিদারের অন্যায় হাতি ধরা আইনের বিরুদ্ধে হাজং প্রজাদের সংগঠিত করে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। জমিদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে তিনি অসীম সাহসের পরিচয় দেন এবং এই সংগ্রামে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম।
ব্রজিবহারী বর্মণ ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তা ও বিপ্লবী সাহিত্যের একজন পথিকৃৎ প্রকাশক। তিনি কলকাতায় 'বর্মণ পাবলিশিং হাউস' প্রতিষ্ঠা করে নজরুলের নিষিদ্ধ বইসহ অসংখ্য রাজনৈতিক ও সাম্যবাদী গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এ কারণে তিনি ব্রিটিশ সরকারের হাতে কারারুদ্ধ হন এবং তার প্রেস বাজেয়াপ্ত হয়। শারীরিক নির্যাতন সত্ত্বেও তিনি আজীবন বাঙালির মুক্তির জন্য প্রগতিশীল সাহিত্য প্রসারে নিবেদিত ছিলেন।
ব্রজেন্দ্র সরকার বিশ শতকের নেত্রকোণা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির এক পরিচিত ব্যক্তিত্ব। পেশায় শিক্ষক হলেও নেশা হিসেবে তিনি কবিগান চর্চা করতেন। বিশ শতকের ষাট থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ অঞ্চলের টপ্পার আসরে নিয়মিত গান পরিবেশন করে লোকজ ঐতিহ্য বহন করেছেন। কবিগানের প্রসারে তার শিক্ষকসুলভ পাণ্ডিত্য ও গায়কী স্থানীয় সংস্কৃতি প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত ছিল।
ডক্টর ব্রজেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক মেধাবী বিজ্ঞানী। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং নোবেল বিজয়ী ড. সি ভি রমনের সহযোগী ছিলেন। তিনি ১৯২২ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএসসি লাভ করেন। তার মৌলিক গবেষণাপত্রগুলো উচ্চশিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে। নেত্রকোণার এই কৃতি সন্তান বিজ্ঞান গবেষণায় বিশ্বব্যাপী অবদান রেখে গেছেন।
মংলা ছিলেন উনিশ শতকের শেষভাগের একজন নির্ভীক আদিবাসী যোদ্ধা। সুসঙ্গ দুর্গাপুর অঞ্চলে জমিদারদের অন্যায় হাতির খেদা এবং প্রজা শোষণের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিদ্রোহে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। হাতীখেদা বিরোধী এই সশস্ত্র প্রতিরোধে সম্মুখ সমরে জমিদার বাহিনীর হাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আদিবাসীদের অধিকার ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় আজও উজ্জ্বল।
এম আর খান ছিলেন বাংলাদেশের পাট শিল্পের একজন পথিকৃৎ এবং দানশীল ব্যক্তিত্ব। তিনি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার শীর্ষস্থানীয় বাঙালি পাট রপ্তানিকারক হিসেবে লন্ডনের ডান্ডিতে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ময়মনসিংহে 'মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ' সহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নারী শিক্ষা প্রসারে তার অবদান অনস্বীকার্য এবং অত্যন্ত গৌরবময়।
মঙ্গল সরকার ছিলেন মণি সিংহের নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক টংক আন্দোলনের এক সাহসী লড়াকু যোদ্ধা। ১৯৪৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি লেংগুরা হাটে টংক প্রথা উচ্ছেদের সমর্থনে প্রচার চালাতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। তার এই বীরোচিত মৃত্যু আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং হাজার হাজার কৃষককে জাগিয়ে তোলে। নেত্রকোণার কৃষক আন্দোলনে তার নাম চিরস্মরণীয়।
দেওয়ান মজলিস জালাল ছিলেন বারো ভূঁইয়া প্রধান ঈসা খাঁর অন্যতম সেনাপতি এবং উপদেষ্টা। তিনি ষোড়শ শতাব্দীতে নেত্রকোণার কেন্দুয়া অঞ্চলের রোয়াইলবাড়িতে তার প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেন। ময়মনসিংহ অঞ্চলে ঈসা খাঁর রাজ্য বিস্তার ও স্থানীয় শাসন সুসংহত করতে তার রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বংশধরেরা আজও এই অঞ্চলের ইতিহাসে গভীর ছাপ ধরে রেখেছে।
কমরেড মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তিনি ঐতিহাসিক টংক ও তেভাগা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শোষিত মানুষের মুক্তি এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে তার আপসহীন সংগ্রাম ও ত্যাগ বাঙালির ইতিহাসে তাকে অমর করে রেখেছে।
এম এম চৌধুরী একজন নিবেদিতপ্রাণ অধ্যাপক এবং সমাজহিতৈষী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ঢাকার তেজগাঁওস্থ তৎকালীন বঙ্গবাসী কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য মৈত্রী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে প্রতিষ্ঠিত 'বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান'-এর অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। নিজ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান ও কলেজের জন্য কাজ অনবদ্য।
তিনি হাজং ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ গবেষক। তাঁর লেখনীতে হাজংদের সামাজিক অনুশাসন ও লোকসংস্কৃতি নিপুণভাবে ফুটে ওঠে। দীর্ঘকাল শিক্ষকতার পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী কৃষ্টি সংরক্ষণে কাজ করেছেন। তাঁর গবেষণা প্রবন্ধগুলো বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠী বিষয়ক জ্ঞানভাণ্ডারকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে।
তিনি নেত্রকোণা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। তাঁর রচিত 'জীবনের তাৎপর্য ও শিক্ষা' গ্রন্থটি শিক্ষাধারায় এক বিশেষ সংযোজন। দীর্ঘকাল শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি নেত্রকোণা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক পরম শ্রদ্ধেয় অভিভাবক ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত।
রাজা মদন কোচ ছিলেন একাদশ শতাব্দীর নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন শক্তিশালী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সামন্ত প্রধান। ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে সুদূর রোম থেকে আগত প্রখ্যাত সুফী সাধক হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী অত্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচার শুরু করলে তার সাথে মদন কোচের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। অবশেষে সাধকের আধ্যাত্মিক শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে তিনি সপরিবারে রাজধানী ত্যাগ করেন।
মদন সরকার ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের এক অনন্য চারণ গায়ক ও কবিয়াল। দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে তিনি কবিগান গেয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহে লোকসংস্কৃতি রক্ষা করেছেন। তার টপ্পা ও ছন্দের মাধ্যমে মানুষের জীবনের না বলা কথাগুলো চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। শেষ জীবনে দারিদ্র্যের কশাঘাতে থালা-বাসনে নাম লিখে জীবিকা নির্বাহ করলেও, লোকজ সংস্কৃতির এই মহাজন আজও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছেন।
মনসুর বয়াতি ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর কালজয়ী লোককবি। তিনি বিশ্ববিশ্রুত 'দেওয়ানা মদিনা' পালার রচয়িতা। নিরক্ষর হয়েও করুণ রস সৃষ্টিতে তার অসাধারণ প্রতিভা আন্তর্জাতিক মনীষী রোম্যাঁ রোলাঁকেও মুগ্ধ করেছিল। 'মৈমনসিংহ গীতিকা'র অন্যতম এই কবির হাত ধরে বাংলা লোকসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় এক অনন্য মযাদা লাভ করেছে। তার সৃষ্টি আজও বাঙালির প্রাণের সম্পদ হিসেবে সমাদৃত।
মনা সর্দার বা মনা হাজং ছিলেন উনিশ শতকের শোষিত মানুষের এক অকুতোভয় বিপ্লবী নেতা। তিনি নেত্রকোণার ঐতিহাসিক 'হাতীখেদা' আন্দোলনের সাহসী নেতৃত্ব দেন। জমিদারের অমানুষিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত বন্দী হন। ১২২৭ বঙ্গাব্দের ৪ পৌষ কুখ্যাত লাঠিয়াল বাহিনী তাকে হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট করে নির্মমভাবে হত্যা করে। তার বীরত্ব আজও শোষিত মানুষের কাছে প্রেরণা।
তিনি বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় নাট্য অভিনেতা ও মডেল। নব্বইয়ের দশকের টেলিভিশন নাটকের অন্যতম শীর্ষ অভিনেতা হিসেবে তাঁর খ্যাতি দেশজুড়ে। অসংখ্য মঞ্চায়নেও তিনি অংশ নিয়েছেন। তাঁর নিপুণ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক গৌরবকে জাতীয় স্তরে সার্থকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
মন্টু রাজভর ছিলেন নেত্রকোণা শহরের এক অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি মোক্তারপাড়া মাঠের পাশে সারা জীবন অত্যন্ত সুনামের সাথে খিলিপান বিক্রি করেছেন, যা তিনি বেনারস থেকে শিখে এসেছিলেন। তার রুচিশীল খিলিপান শহরের সবস্তরের মানুষের কাছে প্রিয় ছিল। তিনি আমৃত্যু নাগড়ার বিখ্যাত নাগেশ্বর মহাদব শিব মন্দিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ভূমিকা রাখেন।
আব্দুল মমিন ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কাণ্ডারি ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান রচয়িতা কমিটির সদস্য এবং স্বাধীন বাংলাদেশের খাদ্য ও ত্রাণ মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনিই সর্বপ্রথম 'কাজের বিনিময়ে খাদ্য' কর্মসূচি চালু করেন, যা বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার বিরুদ্ধে এক অনন্য মডেল হিসেবে স্বীকৃত।
সাবেক খাদ্য ও ত্রাণ মন্ত্রী এবং প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাসঙ্গী ছিলেন। ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হন এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
তিনি বাংলাদেশের সাবেক খাদ্য ও ত্রাণ মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি 'কাজের বিনিময়ে খাদ্য' কর্মসূচির প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত।
তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন প্রখ্যাত শব্দসৈনিক এবং জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী। তাঁর অসংখ্য কালজয়ী গান বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। সংগীতে অবদানের জন্য তিনি জাতীয় পর্যায়ে সুপরিচিত এবং নেত্রকোণার লোকজ ও দেশাত্মবোধক গানের এক রত্ন।
মহাদেব সান্যাল ছিলেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী এবং আজীবন সাম্যবাদী রাজনীতির অগ্রপথিক। তিনি ছাত্রজীবনেই অনুশীলন সমিতির সাথে যুক্ত হন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে একাধিকবার কারাবরণ করেন। টংক আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। দীর্ঘ কারাবাস ও নিপীড়ন সহ্য করেও তিনি আমৃত্যু মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
সৈয়দ মাজাহারুল হক বা কাঞ্চন মিঞা ছিলেন ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক বিরল প্রতিভা। তিনি বিখ্যাত ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর কাছে তালিম নিয়ে খেয়াল ও রাগ সংগীতে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তার শিল্পী সত্তার পাশাপাশি তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দুইবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নেত্রকোণা অঞ্চলের মার্গীয় সংগীত চর্চায় তার অবদান এবং সামাজিক নেতৃত্ব আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
তিনি 'বিরহী কবি' হিসেবে নেত্রকোণা অঞ্চলে সুপরিচিত। পেশায় সরকারি কর্মকর্তা হলেও সাহিত্য সাধনায় নিবেদিত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থসমূহ পাঠকদের মাঝে আবেগী আবেদন তৈরি করেছে। তিনি বিভিন্ন সংকলনের মাধ্যমে আঞ্চলিক সাহিত্যকে উৎসাহিত করছেন। তাঁর লেখনীতে গ্রাম বাংলার লোকজ মমতা ও মানুষের বিরহ গাথা মূর্ত হয়।
মাহবুব তালুকদার ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি, কথাশিল্পী এবং দক্ষ আমলা। তিনি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে তার সাহসী ও স্পষ্টবাদী ভূমিকার জন্য অত্যন্ত পরিচিত ছিলেন। ২০১২ সালে তিনি শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তার ২২টিরও বেশি প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি এবং একজন প্রতিভাবান কবি। বিচারক হিসেবে দক্ষতার পাশাপাশি সমাজ ও সাহিত্য চর্চায় নিবিড়ভাবে জড়িত। তিনি নেত্রকোণার মদন অঞ্চলে শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা করে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে অবদান রাখছেন।
মো. মিরাজ আলী ছিলেন নেত্রকোণার এক যশস্বী বাউল সাধক, যিনি 'কাঁটা বিচ্ছেদ' গানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বাউল রশীদ উদ্দিনের সান্নিধ্যে এসে তিনি বাউল তত্ত্বে পারদর্শী হন। তার রচিত বিচ্ছেদ ও মরমী গানগুলো সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। লোকসঙ্গীতের প্রাচীন সুরগুলোকে নিজ কণ্ঠে বাঁচিয়ে রেখে তিনি নেত্রকোণার মরমী সঙ্গীত ধারাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
মিরাশী বেগম ছিলেন এক অদম্য সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি মদন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। তিনি রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য সরবরাহ এবং পাকিস্তানি সেনাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে অনন্য ভূমিকা রাখেন। অস্ত্র চালনায় পারদর্শী এই বীর নারী সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছেন। তার বীরত্বপূর্ণ অবদান নেত্রকোণার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ।
মাওলানা মিরাস উদ্দিন ছিলেন একাধারে একজন প্রখ্যাত বাউল সাধক, সুফীবাদী কবি এবং পীর। তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন এবং আধ্যাত্মিক গানে সৃষ্টিতত্ত্ব ও মানবতত্ত্বের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তার রচিত 'শান্তি সোপান' ও 'সুধাসিন্ধু' লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে তিনি শিক্ষকতা করেছেন এবং লোকসঙ্গীতের মাধ্যমে মানুষের আত্মিক জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি নেত্রকোণার একজন প্রখ্যাত পালাকার এবং কিচ্ছা গায়ক। তিনি নিজেই একাধিক পালা রচনা করেছেন এবং লোকসংস্কৃতি রক্ষায় গ্রামীণ মেলা ও উৎসবে নিয়মিত পারফর্ম করেন। মহুয়া সুন্দরী পালায় তাঁর নান্দনিক উপস্থাপনা নেত্রকোণা ও ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং লোকজ ঐতিহ্য রক্ষায় সহায়ক।
মুজীবুর রহমান খাঁ ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের এক কিংবদন্তি এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি 'দৈনিক আজাদ' ও 'দৈনিক পয়গাম' পত্রিকার সম্পাদনা করে বাঙালির মনন চর্চায় বিপ্লব ঘটান। ১৯৪৬ সালে ভারতীয় গণ-পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৮০ সালে তিনি সাংবাদিকতায় একুশে পদক লাভ করেন। তার শাণিত লেখনী ও অসামান্য সাংগঠনিক ক্ষমতা সাংবাদিকতা ও সাহিত্য সমাজকে সমৃদ্ধ করেছে।
মুসলেম উদ্দীন বিশ শতকের নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত যাত্রাশিল্পী ছিলেন। তিনি মূলত খল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সারা দেশে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তার শক্তিশালী অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি লোকজ নাট্যাঙ্গনে এক বিশেষ স্থান করে নিয়েছিলেন। সবুজ, কৃষ্ণাকলি ও বুলবুল অপেরার মতো বিখ্যাত যাত্রাদলে কাজ করে তিনি গ্রামীণ জনপদে বিনোদনের প্রসার ও লোকসংস্কৃতির ধারাকে সমুন্নত রাখতে অবদান রাখেন।
খান বাহাদুর মুহাম্মদ আজহার ছিলেন নেত্রকোণা মহকুমার অন্যতম প্রধান প্রশাসক এবং মুসলিম জাগরণের অগ্রপথিক। ১৮৯৭ সালে তার উদ্যোগে 'নেত্রকোণা আঞ্জুমানে ইসলামিয়া' গঠিত হয়। তিনি নেত্রকোণার জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা সংস্কার এবং রেলওয়ে যোগাযোগের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখেন। তার এই অনন্য জনসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ নেত্রকোণা শহরের 'আজহার রোড' তার স্মৃতি আজও ধারণ করে চলেছে।
শহীদ মেহর আলী ছিলেন নেত্রকোণা মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং মুক্তিযুদ্ধের এক নির্ভীক সংগঠক। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও যুবকদের সংগঠিত করে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ১৭ মে ভারতের মহিষখলা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন। নেত্রকোণা শহরের 'মুক্তিযোদ্ধা মেহর আলী সড়ক' তার অম্লান আত্মত্যাগের সাক্ষী হয়ে আছে। তিনি লোকসেবা ও স্বদেশের মুক্তির জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।
হাজী মুহাম্মদ মোজাফর হুসেন ছিলেন নেত্রকোণার একজন প্রথিতযশা পুঁথি লেখক। তার রচিত 'সহি ছফর মক্কা ও মদিনা' পুঁথিটি ১৩৩৫ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়, যা অত্র অঞ্চলের লোকজ ইসলামী সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। পুঁথিটি পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে রচিত। এর ভাষার সারল্য সাধারণ মানুষকে হজের অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়ক হয়েছিল। বিশ শতকের প্রথম ভাগে লোকজ সাহিত্যকে জনপ্রিয় করতে তার অবদান উল্লেখযোগ্য।
তিনি একজন প্রবীণ কবি এবং সাবেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তিনি জাতিসংঘের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার হিসেবে বিশ্বজুড়ে কাজ করেছেন। প্রশাসনিক জীবনের বিশাল অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্য চর্চা নেত্রকোণা জেলার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে এক বিশেষ উচ্চতা দান করেছে এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত বিশিষ্ট আইনজীবী। তিনি ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পূর্বধলা অঞ্চলে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে এবং সামাজিক উন্নয়নে তার ব্যাপক ভূমিকা ছিল।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ এবং দুইবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ-১৩ এবং ১৯৯১ সালে নেত্রকোণা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
তিনি ১১ নং সেক্টরের একজন অসম সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা অঞ্চল শত্রুমুক্ত করার অভিযানে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দেন। নেত্রকোণা ও ভাটি অঞ্চলের স্বাধীনতায় তাঁর সক্রিয় রণকৌশল ও নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর বীরত্বগাথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য সাহসিকতার উদাহরণ।
সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এবং বিজয় বাংলা ফন্টের উদ্ভাবক। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপ্লব ঘটানো এবং কম্পিউটারে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রসারে তার অবদান অনন্য। তিনি বেসিস-এর সাবেক সভাপতি এবং ভাষা সৈনিক।
তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন স্থায়ী বিচারপতি। নেত্রকোণা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করে আইন পেশায় অসামান্য সাফল্য অর্জন করেন। আইনি প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের শাসনে তাঁর অবদান নেত্রকোণা জেলার জন্য এক গর্বের বিষয় এবং বিচার বিভাগের মর্যাদার প্রতীক।
বিজয় বাংলা কিবোর্ডের উদ্ভাবক এবং বাংলাদেশের সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী। তিনি বেসিস ও বিসিএস-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার অন্যতম প্রবক্তা।
মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী ছিলেন ষাট ও সত্তরের দশকের চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী। 'ঐ দূর-দূরান্তে বন বনান্তে' এবং 'এই শহরে আমি যে এক নতুন ফেরিওয়ালা'র মতো অসংখ্য কালজয়ী গান তিনি উপহার দিয়েছেন। নেত্রকোণায় জন্মগ্রহণকারী এই মেধাবী শিল্পী ২০৬টি চলচ্চিত্রে প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান গেয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে তার অনন্য গায়কী এবং সুরের মূর্ছনা তাকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
মোহিনী মোহন গুণ ছিলেন নেত্রকোণার বারহাট্টা অঞ্চলের এক মহান শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। তিনি বারহাট্টায় তার পিতার নামে 'বারহাট্টা করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইনস্টিটিউট' (বর্তমান বারহাট্টা সিকেপি উচ্চ বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বারহাট্টা বাজার ও খেলার মাঠ প্রতিষ্ঠার জন্য বিপুল জমি দান করে অত্র অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষা উন্নয়নে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী এবং মার্কসবাদী তাত্ত্বিক। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই লেখক বহু গবেষণা গ্রন্থের রচয়িতা। নেত্রকোণা অঞ্চলে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তিনি প্রধান কাণ্ডারি। শোষিত মানুষের মুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনে তাঁর অবদান তাঁকে এক সর্বজন শ্রদ্ধেয় মনীষীতে পরিণত করেছে।
তিনি ১১ নং সেক্টরের দক্ষ প্লাটুন কমান্ডার এবং গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দেন। বিজয়পুর ও দুর্গাপুর অঞ্চলের অসংখ্য সফল অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যুদ্ধের পর উপজাতীয় কালচারাল একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন। নেত্রকোণার গারো জনগোষ্ঠীর মাঝে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত করতে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম।
যতীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন অবিভক্ত বাংলার এক খ্যাতিমান সাংবাদিক এবং 'আনন্দবাজার পত্রিকা'র দীর্ঘকালীন বাণিজ্য সম্পাদক। তিনি 'যুগান্তর' পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন এবং বাণিজ্য বিষয়ক সাপ্তাহিক 'আর্থিক জগৎ' প্রকাশ করেন। অর্থনীতি বিষয়ে সহজ বাংলায় বিশ্লেষণধর্মী রচনার জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। বহু ব্যাংক ও কোম্পানির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই মেধাবী সাংবাদিক বাংলা সাংবাদিকতাকে ঋদ্ধ করেছেন।
বিশ শতকে নেত্রকোনা অঞ্চলে টঙ্ক ও তেভাগা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি রাসিমণি হাজং এবং কুমুদিনী হাজংদের সমসাময়িক হিসেবে কৃষক ও আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
ব্রিটিশ শাসনামলে টঙ্ক প্রথার বিরুদ্ধে নেত্রকোণার সুসং দুর্গাপুরে সংগঠিত আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার কারণে পাকিস্তান সরকার তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল।
পণ্ডিত যোগেন্দ্রচন্দ্র বিদ্যাভূষণ ছিলেন একজন সংস্কৃত বিশারদ এবং কৃতি সাহিত্যিক। তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অজ্ঞাত লোকসাহিত্যিকদের জীবনী সংগ্রহ ও গবেষণায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। তার অসম্পূর্ণ গ্রন্থ 'বঙ্গীয় অধ্যাপক জীবনী' লোকজ শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। তিনি বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রাচীন ঐতিহ্য ও দর্শন নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখে সমকালীন বিদগ্ধ সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
যোগেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক অকুতোভয় বিপ্লবী এবং অনুশীলন সমিতির সদস্য। ১৯১৩ সালে সিলেটে পুলিশি অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তিনি বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যুবরণ করেন। স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি নিজের জীবন তুচ্ছ করে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। তার অকাল মৃত্যু এবং আত্মত্যাগ তৎকালীন তরুণ সমাজকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছিল।
মহামহোপাধ্যায় ড. যোগেন্দ্রনাথ বাগচী ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংস্কৃত পণ্ডিত ও অধ্যাপক। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন ও বেদান্ত শাস্ত্রের প্রধান অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৩২ সালে তিনি 'মহামহোপাধ্যায়' উপাধি লাভ করেন। তার রচিত 'ভারতীয় দর্শনের সমন্বয়' এবং 'প্রাচীন ভারতের দণ্ডনীতি' শাস্ত্রীয় দর্শনে আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। তার সুগভীর পাণ্ডিত্য ও শিক্ষকতা সংস্কৃত শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে।
তিনি একাধারে কবি, গীতিকার এবং সফল নাট্যকার। তাঁর দুই হাজারেরও বেশি জনপ্রিয় গান লোকসমাজে প্রচলিত। 'মুক্তস্বর' নামক সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি নাট্যচর্চায় অবদান রাখছেন। নেত্রকোণা অঞ্চলের লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণায় তিনি দীর্ঘকাল ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত সক্রিয়।
পল্লীকবি রওশন ইজদানী ছিলেন লোকসাহিত্যের এক কালজয়ী সংগ্রাহক ও গবেষক। তার রচিত 'মোমেনশাহীর লোকসাহিত্য' এবং 'খাতামুন নবীঈন' বাংলা সাহিত্যে তাকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। ১৯৬০ সালে তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। তিনি গ্রামীণ মানুষের জীবনগাথা ও আঞ্চলিক ভাষাকে কবিতার মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছেন। তার লেখনী লোকজ ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও বিকাশে এক আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।
তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক এবং একজন বিশিষ্ট লেখক। কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি 'রাষ্ট্রপতি পুরস্কার' লাভ করেছেন। কৃষি বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রিধারী এই কৃতি সন্তান নেত্রকোণা অঞ্চলের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও কৃষি উন্নয়নে তাঁর পরামর্শ ও লেখনীর মাধ্যমে কৃষকদের নিরন্তর পথ দেখাচ্ছেন।
তিনি ১১ নং সেক্টরের অধীনে মাত্র ১৮ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ধোবাউড়া ও বিজয়পুর অঞ্চলে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অসীম সাহস প্রদর্শন করেন। যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ কৃষিজীবী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। প্রান্তিক হাজং জনগোষ্ঠীর মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর নাম এক অবিস্মরণীয় ত্যাগের প্রতীক।
রমেশ চন্দ্র গোস্বামী ছিলেন বিশ শতকের নেত্রকোণার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ও অভিনেতা। কলকাতার বিখ্যাত 'স্টার থিয়েটার'-এর সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। তার রচিত কালজয়ী ঐতিহাসিক নাটক 'কেদার রায়' মঞ্চে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছিল। এছাড়া 'বিদ্যাপতি' ও 'বিদ্রোহী বাঙালি' তার উল্লেখযোগ্য নাটক। অভিনয়ের দক্ষতা এবং লেখনীর মাধ্যমে তিনি লোকজ ও ধ্রুপদী নাট্যাঙ্গনকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।
বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের 'মালেজোড়া' বাউল গানের প্রবর্তক। তার রচিত 'আমার সোয়া চান পাখি' এবং 'মানুষ একটা কলের গাড়ি'র মতো গানগুলো বিশ্বব্যাপী বাঙালির প্রাণের খোরাক। তিনি ছিলেন একাধারে সঙ্গীতস্রষ্টা এবং আধ্যাত্মিক তাত্ত্বিক। ১৯৯৯ সালে তাকে মরণোত্তর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তার ঘরানার মাধ্যমেই নেত্রকোণা বাউল গানের উর্বর ভূমি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
তিনি নেত্রকোণার একজন প্রখ্যাত যাত্রা নির্দেশক এবং পালাকার। শতাধিক যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করেছেন এবং নিজে অনেক পালা রচনা করেছেন। যাত্রা শিল্পে অবদানের জন্য তিনি 'নাট্যজন সম্মাননা' পেয়েছেন। গ্রামীণ জনপদে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তাঁর ৪৫ বছরের নিরলস সাধনা জেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁকে বিশেষ আসন দিয়েছে।
রাজা রাজসিংহ ছিলেন নেত্রকোণার সুসঙ্গ রাজবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা এবং শক্তিমান কবি। তিনি কাব্য ও সংগীতের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন। তার রচিত 'ভারতী মঙ্গল' এবং 'মনসার পাঁচালী' লোকসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শাসক হিসেবে তিনি প্রজাবৎসল ছিলেন এবং একইসাথে সাহিত্যচর্চায় অনন্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। তার সৃজনশীল লেখনী উনিশ শতকের শুরুর দিকে নেত্রকোণার সাহিত্য ঐতিহ্যে এক উজ্জ্বল মাত্রা যোগ করেছে।
১৯৪৬ সালে ময়মনসিংহের টঙ্ক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ও প্রথম শহীদ। তিনি টঙ্ক প্রথা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন এবং একজন কৃষকবধূকে বাঁচাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান।
ব্রিটিশ বিরোধী টঙ্ক ও তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী। ১৯৪৬ সালে বেহরাতলী গ্রামে পুলিশি হামলার সময় কুমুদিনী হাজংকে রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে তিনি প্রথম শহীদ হন। তার এই ত্যাগ হাজং কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
তিনি ১১ নং সেক্টরের অধীনে ১৬ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দুর্গাপুর ও শিববাড়ী অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। নেত্রকোণা জেলার পাহাড়ি সীমান্তের প্রতিরক্ষা ও স্বাধীনতায় তাঁর মতো সাহসী যোদ্ধাদের অবদান জেলার মুক্তিকামী মানুষের কাছে পরম শ্রদ্ধার সাথে সবসময় স্মর্তব্য হয়ে থাকবে।
তিনি একজন খ্যাতিমান নাট্যকার এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তাঁর বেশ কিছু নাটক প্রকাশিত ও মঞ্চস্থ হয়েছে এবং তিনি একাধিক সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছেন। নির্দেশক হিসেবে তাঁর কাজ অত্যন্ত উচ্চমানের। নেত্রকোণা জেলার আধুনিক শিল্প ও সাহিত্যচর্চায় তিনি এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও কৃতি ব্যক্তিত্ব।
সাবেক সংসদ সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মমিনের সহধর্মিণী। তিনি নেত্রকোনা-৪ আসন থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নারী উন্নয়ন ও এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে তার বিশেষ অবদান রয়েছে।
তিনি 'বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ'-এর প্রতিষ্ঠাতা। মহান মুক্তিযুদ্ধে আহতদের সেবায় তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন। তুখোড় ছাত্রনেত্রী থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় তিনি কাজ করেছেন। নারী অধিকার ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর চার দশকেরও বেশি সময়ের নেতৃত্ব বাংলাদেশের নারী জাগরণে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
লিলি হক নেত্রকোণার একজন বিশিষ্ট কবি ও আবৃত্তি শিল্পী। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'অরণ্য আমার অরণ্য' উল্লেখযোগ্য। তিনি সাহিত্যে অবদানের জন্য ড. আশরাফ সিদ্দিকী স্বর্ণপদকসহ একাধিক জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছেন। তাঁর কাজ নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আধুনিক ও সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ইপিআর সদস্য এবং বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। ৮ নং সেক্টরের অধীনে যশোরের ঝিকরগাছায় পাকিস্তানি বাহিনীর টহল দলকে অ্যাম্বুশ করার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য হিসেবে অসীম সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। ১৬ই ডিসেম্বর সিলেটে যুদ্ধরত অবস্থায় বাঙ্কারে গোলা পড়ে তিনি শহীদ হন। তাকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়।
ইপিআরের সদস্য এবং বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিযানে পাকিস্তানি সেনাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।
শান্ত বয়াতি নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতির একনিষ্ঠ সেবক এবং জারিগান ও কিসসা গায়নে দক্ষ শিল্পী। তিনি প্রায় ৩৩টি পালা আয়ত্ত করেছেন। গ্রামীণ সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত কিসসা পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি লোকঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, যা আঞ্চলিক সংস্কৃতিতে অনন্য প্রভাব ফেলেছে।
ড. শামীমা সুলতানা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক ও গবেষক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ 'মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে চৌতিশা'। তিনি নেত্রকোণার নারী শিক্ষা ও উচ্চতর গবেষণার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তাঁর গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড বাংলা সাহিত্যের তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং লোকজ ধারাকে ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ ও আধুনিক করতে সাহায্য করেছে।
শাহ মো. আলমগীর কবির একজন কৃতি যাদুশিল্পী ও অভিনেতা। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত যাদু প্রদর্শন করেন। ২০০১ সালে বিশ্ব যাদু প্রতিযোগিতায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যাদুশিল্পকে জনপ্রিয় করতে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে জেলার প্রতিনিধিত্ব করতে তাঁর বিশেষ অবদান অনস্বীকার্য।
অধ্যাপক কে এম শাহজাহান কবীর ছিলেন নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক অন্যতম রূপকার। তিনি নেত্রকোণা শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং উষসী সঙ্গীত বিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা ছিলেন। তার রচিত 'যে গান হয়নি গাওয়া' সাহিত্য সমাজে সমাদৃত। তিনি দীর্ঘকাল বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। নেত্রকোণার শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার প্রসারে তার অবদান অনস্বীকার্য এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়।
শাহাব উদ্দিন আহাম্মদ বিশ শতকের নেত্রকোণা অঞ্চলের একজন উল্লেখযোগ্য কবি ও গবেষক ছিলেন। লোকজ ঐতিহ্যের উপর তার গভীর আগ্রহ ছিল। তার প্রকাশিত গ্রন্থ 'পাক গীতিকা' অত্র অঞ্চলের ধর্মীয় ও মরমী গানের এক সুন্দর সংকলন। তিনি লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলো সংগ্রহের মাধ্যমে এই অঞ্চলের কাব্যচর্চাকে গতিশীল করেছেন। তার লেখনীর মাধ্যমে নেত্রকোণার নিভৃত লোকজ সুরগুলো সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে।
বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনন্য সংকটে তাতাঙ্কক অভিভাবক। তিনি ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে একটি অবাধ নির্বাচন সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার সততা, নিরপেক্ষতা এবং আইনি প্রজ্ঞা বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
শীতলদাস জোয়ারদার বিশ শতকের একজন বিশিষ্ট কবি ও ছড়াকার। তার লেখনী দুই বাংলার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো। তিনি 'গঙ্গা আর পদ্মার মাটি' নামক দুই বাংলার কবিতা সংকলন সম্পাদনা করে সমাদৃত হন। তার প্রতিটি সৃষ্টিতে মাটি ও মানুষের প্রাণের কথা সহজ ভাষায় ফুটে উঠেছে। নেত্রকোণার সাহিত্য অঙ্গনে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরিতে তার অবদান চিরস্মরণীয়।
শুক্লা পঞ্চমী হাওড়ের লোকজীবন নিয়ে গবেষণার জন্য পরিচিত। তিনি 'জলঘুঙুরের পদাবলী' ও বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। লোকঐতিহ্য বিষয়ক পত্রিকা 'গাঙঢুফী'র সম্পাদক হিসেবে তিনি নেত্রকোণা ও হাওড়াঞ্চলের লুপ্তপ্রায় লোকজ সংস্কৃতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণে অনন্য ভূমিকা পালন করছেন, যা জেলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অমূল্য অংশ।
শেখ মাসুদ কামাল একজন দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও প্রাবন্ধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ হলো বার্ট্রান্ড রাসেলের শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থের সার্থক বঙ্গানুবাদ। তিনি 'নিবন্ধিত প্রবন্ধ' ও 'প্রবন্ধ-সংগ্রহ' এর মাধ্যমে মননশীল সাহিত্যের ধারা বিকশিত করেছেন। প্রশাসনিক ব্যস্ততার মধ্যেও জ্ঞানতাত্ত্বিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান নেত্রকোণার বিদ্বৎসমাজে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়েছে।
ড. শৈলজারঞ্জন মজুমদার ছিলেন বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনের অধ্যক্ষ এবং রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত স্নেহভাজন শিষ্য। তিনি রবীন্দ্রসংগীতের শুদ্ধতা রক্ষায় আমৃত্যু কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে 'আমার গানের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর' বলতেন। বহু কালজয়ী রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি তিনি তৈরি করেছেন। ১৯৩২ সালে নেত্রকোণায় তিনি শান্তিনিকেতনের বাইরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন করে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
শৈলেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন বিশ শতকের শুরুর দিকের এক শক্তিমান সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক। তিনি 'ফরওয়ার্ড', 'হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড' ও 'অ্যাডভান্স' পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য তিনি কারাবরণও করেন। তার রচিত কবিতা ও প্রবন্ধগুলো 'প্রবাসী'র মতো প্রথম সারির সাময়িকীতে প্রকাশিত হতো। নেত্রকোণা অঞ্চলের বৌদ্ধিক চর্চায় তার অবদান ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
শ্যামল চৌধুরী বাংলাদেশের একজন বরেণ্য ভাস্কর, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত 'রাজু ভাস্কর্য'-এর নকশাকার। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে বিজয় ৭১ ও প্রজন্ম শপথ অন্যতম। তিনি সারা দেশে ১৭টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। তাঁর শৈল্পিক কাজের মাধ্যমে নেত্রকোণা ও বাংলাদেশের ইতিহাস ও বীরত্বগাথা চিরস্থায়ী রূপ লাভ করেছে।
শ্যামলেন্দু পাল নেত্রকোণার একজন প্রবীণ সাংবাদিক ও সংগঠক। তিনি নেত্রকোণা প্রেসক্লাব ও জেলা সাংবাদিক কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। দীর্ঘকাল সাংবাদিকতার মাধ্যমে জেলার উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেত্রকোণার সংবাদ জগতকে সুসংগঠিত করতে এবং তরুণ সাংবাদিকদের দিকনির্দেশনা প্রদানে তিনি অগ্রণী।
২০০৪ সালে মিস বাংলাদেশ নির্বাচিত হয়ে বিনোদন জগতে প্রবেশ করেন। তিনি বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী এবং মডেল। বর্তমানে তিনি সপরিবারে কানাডায় বসবাস করছেন।
কাঙ্গাল শ্রীনাথ ছিলেন উনিশ শতকের এক মরমী বাউল সাধক। কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে সামাজিক অবজ্ঞার শিকার হলেও তিনি গানের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক শান্তি খুঁজে নিয়েছিলেন। তার রচিত অসংখ্য ভক্তিমূলক গান লোকসমাজে ব্যাপক সমাদৃত হয়। বলা হয়, তার গানের সাধনাই তাকে দূরারোগ্য ব্যাধির যন্ত্রণা থেকে মুক্ত রেখেছিল। নেত্রকোণার মরমী সঙ্গীত ঐতিহ্যে তার নাম এক গভীর শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়।
শ্রীশচন্দ্র ধর গুপ্ত ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি ১৯১০ সালে নেত্রকোণা বারে আইন ব্যবসা শুরু করেন এবং পাশাপাশি স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৩০-৩২ সালে তিনি নেত্রকোণা মহকুমা কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার সাহসী নেতৃত্ব নেত্রকোণায় জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে।
সঞ্জয় সরকার একাধারে সাংবাদিক, ছড়াকার ও গবেষক। তিনি নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতি নিয়ে 'নেত্রকোণার লোক-লোকান্তর' এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। তিনি এ অঞ্চলের বাউল ঐতিহ্যের তাত্ত্বিক সংগ্রহে বিশেষ অবদান রাখছেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রান্তিক শিল্পীদের কথা জাতীয় মাধ্যমে তুলে ধরতে তাঁর নিরলস শ্রম অত্যন্ত কার্যকর।
তিনি বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির প্রাচীন পুঁথি বিভাগে কর্মরত ছিলেন এবং বহু সংস্কৃত ও বাংলা প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো 'কৌলমার্গ-রহস্য' গ্রন্থের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা। এছাড়া কালীতন্ত্র ও রঘুনন্দনকৃত বিভিন্ন গ্রন্থ সম্পাদনা করে তিনি বাংলা সাহিত্য ও তন্ত্রশাস্ত্র গবেষণায় বিশেষ অবদান রেখেছেন।
ড. মো. সদরুল আমিন কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচিত কৃষি বিষয়ক ২০৮টি গবেষণা প্রবন্ধ এবং ৩৫টি পাঠ্যপুস্তক কৃষি শিক্ষায় বড় ভূমিকা রেখেছে। নেত্রকোণার কৃতি সন্তান হিসেবে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তাঁর অবদান এই খাতের উন্নয়নে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নেত্রকোণার অন্যতম প্রথম নারী বাউলশিল্পী হিসেবে তিনি পরিচিত। পীর পরিবারের সন্তান হয়েও বাউল গানে উদ্বুদ্ধ হন এবং মালেজোড়া বাউল গানে পারদর্শিতা অর্জন করেন। মঞ্চে নারী বাউল হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির ধারায় এক অনন্য এবং বৈপ্লবিক মাত্রা যোগ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১নং সেক্টরের এই বীর যোদ্ধা ২৮ জুন বিজয়পুর যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কমলবাড়ি ক্যাম্প আক্রমণের সময় সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দুর্গাপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় প্রাঙ্গণটি 'শহীদ সন্তোষ পার্ক' নামে নামকরণ করা হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রথিতযশা অধ্যাপক সামাজিক ইতিহাসের ওপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'ল্যাঙ্গুরেজ মুভমেন্ট অ্যান্ড দি মেকিং অফ বাংলাদেশ'। তিনি আইবিএস-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জার্নালে তাঁর ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক বহু উচ্চমানের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
সরোজ মোস্তফা নেত্রকোণার একজন শক্তিমান কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি সাহিত্য পত্রিকা 'অনুধ্যান' সম্পাদনা করেন। তাঁর লেখনীতে নেত্রকোণার কৃতি ব্যক্তিত্বদের জীবন ও সাহিত্যের নিবিড় বিশ্লেষণ ফুটে ওঠে। তিনি জেলার সৃজনশীল সাহিত্যচর্চাকে আধুনিক ও মননশীল করতে অনন্য ভূমিকা পালন করছেন, যা স্থানীয় সাহিত্যিক সমাজকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
সাইফুল্লাহ ইমরান নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী। তিনি আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে সাহিত্যমুখী করতে বিশেষ অবদান রেখেছেন। 'অক্ষর' সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে তিনি জেলার প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারাকে বেগবান করেছেন। তাঁর বাচনিক শিল্প জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে।
সাজ্জাদ খান নেত্রকোণার একজন কৃতি শিল্পী, যিনি টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'হৃদয়ের অন্তর্বাস' প্রশংসিত হয়েছে। তিনি কবিতা ও নাট্যচর্চার মাধ্যমে নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আধুনিক গণমাধ্যমে উপস্থাপন করছেন। তাঁর শিল্পকলা চর্চা জেলার সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ ও আধুনিক করতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
সাজ্জাদুল হাসান নেত্রকোণা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং একজন বিশিষ্ট সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি জনকল্যাণ ও রাজনীতির মাধ্যমে নেত্রকোণা জেলার হাওড়াঞ্চলসহ সামগ্রিক উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে জেলার শিক্ষা ও অবকাঠামোগত সংস্কার কাজ দ্রুততর হয়েছে, যা আধুনিক নেত্রকোণা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তিনি ১৯৭০ সালে এমএলএ এবং ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মেঘালয়ের বাঘমারা ও মহেষখলা ইয়ুথ ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ অবদান রাখেন।
সাবেক সংসদ সদস্য এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য। মুক্তিযুদ্ধে তিনি বাঘমারা এবং মহেশখোলা ইয়ুথ ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেন। নেত্রকোনায় তিনি একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে সমাদৃত ছিলেন।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের এই প্রখ্যাত কবিয়াল বৃহত্তর ময়মনসিংহে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। স্বল্প শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও ধর্মশাস্ত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি তাঁর সুরেলা কণ্ঠ ও উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে কবিগানের আসর মাতিয়ে রাখতেন এবং এই লোকজ ধারাকে সমৃদ্ধ করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নেত্রকোণা জেলার দ্বিতীয় মুসলিম গ্র্যাজুয়েট হিসেবে তিনি আঞ্জুমান স্কুলের শিক্ষকতা এবং দীর্ঘ ৫২ বছর আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির নেতা হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। তিনি নেত্রকোণা মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন।
সিরাজ উদ্দিন আহমাদ আরবী ও ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে একজন উচ্চমানের পণ্ডিত। তিনি আরবী বিশ্বকোষের বাংলা অনুবাদক এবং অসংখ্য মৌলিক গ্রন্থের রচয়িতা। তাঁর জ্ঞানতাত্ত্বিক কাজ নেত্রকোণার আরবী সাহিত্য ও অনুবাদ চর্চাকে আন্তর্জাতিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করছেন।
সিরাজ উদ্দিন পাঠান নেত্রকোণার একজন প্রখ্যাত বাউলশিল্পী। হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া গানটি দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। নেত্রকোণার ঐতিহ্যবাহী বাউল ধারাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করতে তাঁর ভূমিকা প্রবাদতুল্য। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাঁর কণ্ঠ ও সংগীত সাধনা বাউল সংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
নেত্রকোণা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এবং ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তিনি কৃষি বিষয়ে প্রায় সতেরোটি গবেষণাপত্র এবং 'রূপসীর বাঁধ' নামক সামাজিক নাটক রচনা করেন। বিদেশে উচ্চতর শিক্ষার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের আধুনিক কৃষি শিক্ষা ও সম্প্রসারণ পদ্ধতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী অবদান রেখে গেছেন।
মো. সিরাজুল হক ভূঞা বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'প্রকৃতি ও ভালোবাসা' সমাদৃত হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নিয়মিত গান ও কবিতা রচনার মাধ্যমে তিনি নেত্রকোণা তথা বাংলাদেশের সাহিত্য পরিমণ্ডলে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। তাঁর সৃজনশীলতা জেলার সাংস্কৃতিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে।
কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে তিনি তেভাগা ও টংক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। জীবনের দীর্ঘ সময় কারাভোগ ও আত্মগোপন অবস্থায় তিনি কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন। আমৃত্যু নেত্রকোণা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি অবহেলিত মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ে আজীবন লড়াই চালিয়ে গেছেন।
কলকাতার বিখ্যাত 'প্রবাসী' পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে তিনি দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'জলের লিখন' এবং উপন্যাস 'আবছায়া' বাংলা সাহিত্যে সমাদৃত। তিনি মূলত রোমান্টিক ভাবধারার সফল কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সাহিত্যে লোকজ ও নাগরিক চেতনার এক চমৎকার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায় যা তাঁকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।
সুধীর দাস বৃহত্তর ময়মনসিংহের নাট্য আন্দোলনের এক পরিচিত নাম। তিনি 'মৈমনসিংহ গীতিকা'র মহুয়া পালাকে নৃত্যনাট্যে রূপদানে সহায়তা করেছেন। তাঁর রচিত 'ময়মনসিংহের নাট্য-পরিক্রমা' এই অঞ্চলের নাট্য ইতিহাসের অমূল্য দলিল। চিত্রাঙ্কন ও নাট্যচর্চার মাধ্যমে তিনি নেত্রকোণার শিল্প-সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে দীর্ঘকাল ধরে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে অনন্য অবদান রাখছেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এই বীর আদিবাসী যোদ্ধা আটপাড়া সীমান্ত ক্যাম্প পাকিস্তানি বাহিনীর দখলমুক্ত করার লড়াইয়ে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। তাঁর মরদেহ ১১৫২ নং সীমান্ত পিলারের কাছে সোমেশ্বরী নদীর তীরে শ্রদ্ধার সাথে দাহ করা হয়েছিল।
সুনীল কর্মকার নেত্রকোণার একজন কিংবদন্তি দৃষ্টিহীন বাউলশিল্পী ও যন্ত্রসংগীত পারদর্শী। ২০২২ সালে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক লাভ করেন। তিনি বিদেশেও লোকগান পরিবেশন করে নেত্রকোণার সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। লোকসংগীতের প্রতি তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও নিরলস সাধনা জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বস্ততার সাথে ধারণ ও রক্ষা করছে।
সুবেন্দ্র সাংমা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সাহসী যোদ্ধা। তিনি ১১নং সেক্টরের অধীনে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর এই ত্যাগ নেত্রকোণা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল এবং অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত।
সুমিত্র সুজন নেত্রকোণার একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ কবি ও সংস্কৃতিকর্মী। তিনি স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে নেত্রকোণার সাহিত্য আন্দোলনকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর কবিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা জেলার উদীয়মান কবিদের মাঝে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে। প্রগতিশীল সংস্কৃতির সেবায় তাঁর এই নিবেদন জেলার সাহিত্য অঙ্গনে আশার আলো দেখাচ্ছে।
তিনি ছিলেন সুলতান কমরউদ্দীন রুমীর দীক্ষাগুরু এবং ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোণার মদনপুরে আসেন। তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা ও তবলিগি কাজে এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে। মদনপুরে অবস্থিত তাঁর মাজার শরীফ আজ 'মীর সাহেবের দরগাহ' নামে পরিচিত এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও শ্রদ্ধার স্থান।
নেত্রকোণা দত্ত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক এবং স্কুলপাঠ্য ইংরেজি ব্যাকরণ, অনুবাদ ও ভূগোল বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থের প্রণেতা। তাঁর শিক্ষা বিস্তারের প্রচেষ্টা এবং সৃজনশীল পাঠদান পদ্ধতি এই অঞ্চলের ছাত্রদের জ্ঞান বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সুসঙ্গের এই জমিদার কবি, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। 'সৌরভ' পত্রিকায় তাঁর নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হতো। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ 'মৃগনাভি' সুধীসমাজে সমাদৃত হয়েছে। এছাড়া তিনি 'চিরন্তনী' ও একাঙ্কিকা 'লাজের বাঁধ' রচনা করে বাংলা সাহিত্যে এবং স্থানীয় আভিজাত্য সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
তিনি প্রাচীন নেত্রকোণার একজন প্রভাবশালী নারী কবিয়াল ছিলেন। কবিয়াল ছাড়ুনাথের কাছে দীক্ষা নিয়ে তিনি গোপিনী কীর্তনে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তাঁর কীর্তন শুনে মুগ্ধ হয়ে ঘাগড়ার জমিদার তাঁকে লাখেরাজ জমি দান করেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি সত্ত্বেও তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে লোকসংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এবং অস্ট্রিয়ার গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট প্রাপ্ত পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গবেষণামূলক গ্রন্থ 'হিন্দুধর্মে মনোবিদ্যা'। ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি এই শাস্ত্রের প্রসারে কাজ করেছেন।
তিনি ছিলেন নেত্রকোণা অঞ্চলের কবিয়ালদের এক অনন্য পৃষ্ঠপোষক। প্রখ্যাত অন্ধ কবিয়াল তারাচাঁদের কবিত্ব বিকাশে তাঁর অবদান ছিল অনবদ্য। এছাড়া রাম ও রামগতির মতো কবিদের জন্য তিনি কবিগানের আসর বসাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তারাচাঁদ তাঁর প্রতি শোক প্রকাশ করে কবিতা লিখেছিলেন যা শিল্প ও পৃষ্ঠপোষকতার মধুর সম্পর্কের পরিচয় বহন করে।
সেন্টু রায় একজন প্রখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা এবং প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মী। তাঁর নির্মিত তথ্যচিত্র 'টিয়ার্স অব ফায়ার' আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি জহির রায়হান ও আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে ইতিহাস সংরক্ষণে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর সাংস্কৃতিক সাধনা ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ নেত্রকোণা ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
সৈয়দ আলী আকবর একজন দক্ষ সংগঠক ও সাবেক ছাত্রনেতা। তিনি ৯০-এর দশকে ছাত্র রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। এছাড়া তিনি নেত্রকোণা ও আটপাড়া এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জেলার অবকাঠামোগত ও মানবিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
ড. সৈয়দা শামছুন নাহার একজন বিশিষ্ট উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও গবেষক। তিনি উদ্ভিদ বিজ্ঞানের পাশাপাশি সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ করেছেন। তাঁর লেখনী গবেষকদের কাছে প্রশংসিত। নেত্রকোণার কৃতি সন্তান হিসেবে বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা জেলার নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রায় একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
সোমেশ্বর অলি বর্তমান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত গীতিকার ও নাট্যকার। তাঁর গানের কাব্যিক গভীরতা ও নাট্য সংলাপে আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট। সাংবাদিক হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। নেত্রকোণার সমকালীন সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করতে তাঁর আধুনিক গীতিকবিতা ও নাটক বিশেষ ও দূরদর্শী অবদান রেখে চলেছে।
তিনি দুর্গাপুরের সুসঙ্গ এলাকায় হাতিখেদা আন্দোলনের অন্যতম বীর সংগ্রামী ছিলেন। তৎকালীন অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধে প্রজাদের পক্ষ নিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক পর্যায়ে তিনি জমিদারের লাঠিয়াল ও সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে লড়াই করতে করতে দেশের মানুষের অধিকারের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেন।
তিনি ছিলেন হযরত সুলতান কমরউদ্দীন রুমীর বাগদত্তা স্ত্রী, যিনি আধ্যাত্মিক প্রেমের টানে আরব থেকে নেত্রকোণার মদনপুরে আসেন। সারা জীবন ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে কাটিয়ে তিনি এই জনপদেই মৃত্যুবরণ করেন। মধ্য-মদনপুর ফিকর পাড়ায় অবস্থিত তাঁর মাজার 'বিবি সাহেবের দরগাহ' হিসেবে আজও স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ও শ্রদ্ধার স্থান।
ড. স্বপন কুমার ধর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের একজন অধ্যাপক। তাঁর রচিত 'গাণিতিক পরিসংখ্যান' গ্রন্থটি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক পুস্তক। নেত্রকোণার কৃতি সন্তান হিসেবে বিজ্ঞান ও শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা ও অবদান বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পদ এবং উচ্চশিক্ষায় বিশেষ সহায়ক।
স্বপন পাল একজন প্রগতিশীল লেখক ও সংগঠক। তিনি আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তিনি বর্তমানে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাথে যুক্ত থেকে লোকসংস্কৃতি ও প্রগতিশীল সাহিত্য চর্চায় নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর লেখনী ও সামাজিক কর্মকাণ্ড জেলার মননশীল সমাজ গঠনে সহায়ক।
স্বপন বিশ্বাস বাংলাদেশের বিজ্ঞান সাহিত্য চর্চার একজন একনিষ্ঠ কর্মী। তাঁর প্রকাশিত 'বাংলাদেশের বিজ্ঞান আন্দোলন' ও 'আমাদের বিজ্ঞান চিন্তা' গ্রন্থ দুটি বিজ্ঞান সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার হয়েও বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় করার তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা নেত্রকোণা জেলার বিজ্ঞান মনস্কতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
তিনি নেত্রকোণা মহকুমা কৃষক সমিতির সভাপতি এবং কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় লঙ্গরখানা পরিচালনা এবং ১৯৪৫ সালের সারা ভারত কৃষক সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর আত্মজীবনী 'আমার জীবনে কমিউনিস্ট পার্টি' সমকালীন নেত্রকোণার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অমূল্য ও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
তিনি পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালে মোহনগঞ্জ থানায় একটি রাজনৈতিক অপারেশন পরিচালনা করার সময় তিনি তৎকালীন বিরূপ শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষে বীরের মতো শহীদ হন। তাঁর আত্মত্যাগ এই অঞ্চলের রাজনৈতিক বিপ্লবের ইতিহাসে এবং মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
হাফিজুর রহমান ভূঞা একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও ভূমি আইন বিশেষজ্ঞ। তাঁর রচিত 'যুগ পরম্পরায় বাংলার ভূমি আইন' একটি গবেষণাধর্মী প্রামাণ্য গ্রন্থ। তিনি প্রশাসন ও গবেষণার মেলবন্ধন ঘটিয়ে নেত্রকোণার জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড জেলার গুণী সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শ্রদ্ধেয়।
হাবিবুর রহমান খান লোহানী নেত্রকোণার ঐতিহাসিক ও লোকজ জীবন গবেষক। তিনি এ অঞ্চলের হারানো ইতিহাস ও প্রাচীন ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে বিশেষ পরিশ্রম করেছেন। তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণা নেত্রকোণা ও মোহনগঞ্জের ইতিহাস রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পেশাগত জীবনের বাইরে তাঁর এই সাহিত্য সাধনা জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য দলিল।
নেত্রকোণার প্রথিতযশা চিকিৎসক এবং ৫২-র ভাষা আন্দোলনের অকুতোভয় সেনানী। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে শহীদ মিনার নির্মাণের কারিগরদের একজন ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন এবং সারা জীবন দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জন্য কাজ করেছেন। বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও অভিভাবক হিসেবে তাঁর অবদান অপরিসীম।
উনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশকের এই প্রখ্যাত কবিয়াল তাঁর অসাধারণ কবিত্ব প্রতিভার জন্য সারা অঞ্চলে সুপরিচিত ছিলেন। প্রখ্যাত কবিয়াল বিজয় নারায়ণ আচার্য তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর রসাত্মক গীতি কবিতাগুলো আজ কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
তিনি নেত্রকোণা অঞ্চলের জনপ্রিয় 'ঘাটু গান' সংগ্রহের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি নিজে একজন দক্ষ জারি গানের বয়াতি ছিলেন। হারিয়ে যেতে বসা লোকগানগুলো সংগ্রহ করে তিনি এ অঞ্চলের লোকজ ঐতিহ্যকে উত্তর প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন এবং জারি গানের প্রসারে নিরলস কাজ করেছেন।
হাসান ইকবাল নেত্রকোণার একজন তরুণ গবেষক ও কবি। তাঁর লোকজ গবেষণা গ্রন্থগুলো অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ। তিনি তাঁর কাজের জন্য আন্তর্জাতিক ইউনেস্কো পুরস্কার এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কালি ও কলম পুরস্কার লাভ করেছেন। তাঁর নিবিড় লোকজ গবেষণা নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতি ও প্রান্তিক মানুষের সমাজমানসকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
হায়দার জাহান চৌধুরী নেত্রকোণার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ সাংবাদিক। ১৯৭১ সালে তিনি রণাঙ্গনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্বের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে কাজ করছেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তাঁর আপসহীন দেশপ্রেম ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নেত্রকোণার সাংবাদিক ও সমাজসেবী মহলে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বিবেচিত হয়।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিকদের একজন। তাঁর সৃষ্ট হিমু ও মিসির আলী চরিত্র পাঠকদের আলোড়িত করেছে। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং 'আগুনের পরশমণি' এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি ও একুশে পদক লাভ করেন যা তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বীকৃতি।
তিনি ছিলেন আধুনিক ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন এক নারী নেত্রী। ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী হেনা ইসলাম নেত্রকোণা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মেঘালয়ের বাঘমারা শরণার্থী শিবিরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে তিনি আর্তমানবতার সেবায় এক অনন্য ও মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
তিনি নেত্রকোণার প্রথিতযশা মোক্তার এবং 'বিজয়া টকিজ' সিনেমা হলের অংশীদার ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট রাতে স্থানীয় রাজাকাররা তাঁকে বাসা থেকে ধরে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে তুলে দেয় এবং সেই রাতেই মোক্তারপাড়া সেতুর ওপর তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি প্রাণ উৎসর্গ করেছেন।
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ হেমেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন। তিনি উদ্ভিদবিদ্যার একজন বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ছিলেন এবং এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি তথ্যসমৃদ্ধ ও জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ রচনা করেছেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এবং বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণায় তাঁর অবদান এই অঞ্চলের বিদগ্ধ ও উচ্চতর শিক্ষিত সমাজে বিশেষভাবে স্বীকৃত।
হেলাল হাফিজ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবি। তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'যে জলে আগুন জ্বলে' সাহিত্য জগতে বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাঁর কবিতা প্রগতিশীল আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ২০১৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর শক্তিশালী লেখনী নেত্রকোণা তথা বাংলাদেশকে বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় পরিচিত করেছে।
পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রকৌশল শাখা ছেড়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ১১নং সেক্টরের কামালপুর যুদ্ধে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি বাঙ্কার আক্রমণ করেন এবং শত্রুঘেরাওয়ের মধ্যে থেকে একক লড়াই চালিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে 'বীরপ্রতীক' খেতাবে ভূষিত করে। তাঁর ডায়েরি নিয়ে একটি মূল্যবান ইতিহাস গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
হোসনে আরা ফিরোজা একজন কৃতি শিক্ষাবিদ ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। তিনি ঢাকা কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে তিনি নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আলোকিত করেছেন। তাঁর সারগর্ভ প্রবন্ধসমূহ পাঠকদের মনন ও সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করতে এবং উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।