নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন এক দুর্গ। সুলতান হুসেন শাহ, নছরত শাহ আর মসনদে আলী ঈশা খাঁর স্পর্শ লেগে আছে এই মাটিতে। ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা সেই গল্প আজও বলে চলে ৪৬ একরের এই প্রাচীন দুর্গ।
দুর্গের ইতিহাস
'রোয়াইল' একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা অর্থ 'ক্ষুদ্র অশ্বারোহী বাহিনী'। সেই হিসেবে 'রোয়াইলবাড়ি' মানে 'অশ্বারোহী বাহিনীর বাড়ি'। কেন্দুয়া উপজেলা সদর থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বেতাই নদী।
ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কামরূপ দখলের পর তাঁর পুত্র নছরত শাহ সেখানে শাসন করেন। পরে প্রতিপক্ষের আক্রমণে বিতাড়িত হয়ে নছরত শাহ রোয়াইলবাড়িতে আশ্রয় নেন এবং এর নামকরণ করেন 'নছরত ও জিয়াল'। পরবর্তীতে সমগ্র বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল 'নছরতশাহী পরগণা' নামে পরিচিত হয়। এরপর বাঙালির গৌরব ঈশা খাঁ এ অঞ্চলে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি ও নেত্রকোণার রোয়াইলবাড়ি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নেন।
ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পারিষদ দেওয়ান জালাল এখানকার আধিপত্য গ্রহণ করেন। তিনি দুর্গের ব্যাপক সংস্কার করেন এবং বহিরাঙ্গনে নির্মাণ করেন 'মসজিদ-এ জালাল' বা 'জালাল মসজিদ', যেটিতে ছিল ১৫টি গম্বুজ, ১২টি দরজা, ৫টি মেহরাব এবং মার্বেল পাথরের বিশাল খিলান।
ভিডিও কার্টেসি: প্রথম আলো
প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও আবিষ্কার
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত খনন কাজ পরিচালনা করে। প্রায় ৪৬ একর ভূমিতে বিস্তৃত এই দুর্গের মোট আয়তন প্রায় ৫৩৩ × ৪২৬ মিটার। খননে উদ্ধার হয়েছে — সিংহদ্বার (লায়ন গেইট), বহুকক্ষবিশিষ্ট ইমারতের চিহ্ন, সানবাঁধানো ঘাটসহ দুটি বড় পুকুর, দুটি পরিখা, বুরুজ ঢিবি, কবরস্থান, মসজিদ, মিহরাব, টেরাকোটা, পোড়ামাটির অলংকৃত ইট এবং লোহা ও চিনামাটির নানা জিনিসপত্র।
দুর্গের অভ্যন্তরের উত্তর ও পূর্ব দিকের দেয়াল সাদা, নীল, সবুজ ও বাদামি রঙের চকচকে টালিতে ফুল-ফল ও লতাপাতার নকশায় সজ্জিত ছিল। বারোদুয়ারী ঢিবিটি 'বারো দরজার ইমারত' নামে এলাকায় পরিচিত। দক্ষিণ দিকের খোলা ময়দান ছিল সৈন্যবাহিনীর প্যারেড গ্রাউন্ড।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে নেত্রকোণা, নেত্রকোণা থেকে কেন্দুয়া। কেন্দুয়া পৌরসভা থেকে বাস/রিকশা/সিএনজিতে সাহিতপুর বাজার, তারপর অটো বা ইঞ্জিনচালিত যানে সরাসরি রোয়াইলবাড়ী বাজার। বাজার থেকে পায়ে হেঁটে বা রিকশায় দুর্গে পৌঁছানো যায়। ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ থেকেও বাস বা ছোটো যানবাহনে আসা যায়। গুগল ম্যাপ লিংক
ভ্রমণের সময়সূচি
কোথায় খাবেন
কেন্দুয়া বাজার ও রোয়াইলবাড়ী বাজারে স্থানীয় ছোট হোটেলে সাধারণ দেশীয় খাবার পাওয়া যায়। বড় রেস্তোরাঁর জন্য কেন্দুয়া উপজেলা সদরে যেতে হবে।
আবাসন ব্যবস্থা
রোয়াইলবাড়িতে আলাদা আবাসন ব্যবস্থা নেই। রাতে থাকার পরিকল্পনা থাকলে কেন্দুয়া উপজেলা সদর বা নেত্রকোণা জেলা শহরের আবাসিক হোটেলে থাকতে হবে।
আপনার অভিজ্ঞতা, ছবি, ভিডিও তথ্যে সমৃদ্ধ হবে সুবর্ণনেত্র
জমা দিনপাঠানো তথ্য ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে প্রকাশ করা হবে।