নেত্রকোনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ত্যাগ, বীরত্ব এবং পাকবাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের এক কালানুক্রমিক দলিল। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকেই নেত্রকোনার ছাত্র-জনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ২৯শে এপ্রিল পাকবাহিনী নেত্রকোনা শহরে প্রবেশ করার পর থেকে ৯ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত জেলাটি ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সাক্ষী থাকে। প্রায় ৩,০০০ মুক্তিযোদ্ধা এই যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে ৬০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রায় এক হাজার সাধারণ মানুষ শহীদ হন। ত্রিমোহনী সেতু, মোক্তারপাড়া ব্রিজ এবং জারিয়া বধ্যভূমি পাকবাহিনীর নৃশংসতার অন্যতম প্রমাণ।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি
৩রা মার্চ থেকে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং পরবর্তীতে ২৭শে মার্চ থেকে 'সংগ্রাম কমিটি' গঠিত হয়। সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুল মোমিন এমএনএ, আব্বাস আলী খান, এন আই খান, ফজলুর রহমান খান খালেকদাদ চৌধুরী সহ অনেকেই। ছাত্র ও যুব নেতৃত্বে ছিলেন মো. শামসুজ্জোহা, আশরাফ আলী খান খসরু, গোলাম এরশাদুর রহমান, হায়দার জাহান চৌধুরী, মেহের আলী প্রমুখ।
প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহ: নেত্রকোনা মোক্তারপাড়া মাঠ এবং সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ২৭শে মার্চ স্থানীয় পুলিশ অস্ত্রাগার থেকে ৩০০ রাইফেল সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের তুরা, দেরাদুন এবং মহেষখলা ইয়ুথ ক্যাম্পে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
পাকবাহিনীর অনুপ্রবেশ ও দখলদারিত্ব
এপ্রিল - ডিসেম্বর ১৯৭১
২৯শে এপ্রিল পাকবাহিনী সড়ক ও রেলপথে নেত্রকোনায় প্রবেশ করে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো দখল করে নেয়।
- প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (PTI)
- ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট
- সর্বমোহন বণিকের দোতলা বাড়ি (টর্চার সেল)
- সাহা স্টুডিও (নারী নির্যাতনের কেন্দ্র)
- ডাকবাংলো
- মুসলিম লীগ ও নেজামী ইসলামীর নেতাদের সহায়তায় শান্তি কমিটি গঠিত হয়
- রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়
- আল-বদর বাহিনী গঠিত হয়
নৃশংস গণহত্যা ও বধ্যভূমি
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নেত্রকোনার বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। মোক্তারপাড়া ব্রিজ, মগড়া নদীর তীর, জারিয়া রেল স্টেশন, চন্দ্রনাথ স্কুল সংলগ্ন নদীর তীর এবং চল্লিশা রেল সেতু ছিল অন্যতম বধ্যভূমি।
অখিল সেন, হেম সেনসহ বহু মানুষকে এখানে হত্যা করা হয়।
কংস নদের তীরে অসংখ্য মানুষকে হত্যার পর লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হতো। রেল স্টেশনে নির্যাতনের পর এখানে এনে হত্যা করা হতো।
রাজাকারদের সহযোগিতায় এখানে গণহত্যা চালানো হতো।
শহর থেকে নিরীহ মানুষকে ধরে এনে এখানে গুলি করা হতো।
নেত্রকোনা-পূর্বধলা সড়কের ত্রিমোহনী ব্রিজে ১৯৭১ সালের সবচেয়ে বড় গণহত্যাটি ঘটে। ২২শে সেপ্টেম্বর ২৫ জন নিরীহ বাঙালিকে একত্রে গুলি করে হত্যা করা হয়।
অলৌকিক বেঁচে যাওয়া: প্রফুল্ল সরকার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভান করে লাশের সঙ্গে নদীতে পড়ে গিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যান এবং এই ট্র্যাজেডির প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষী দেন।
শহীদ (আংশিক): সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা রায়, কামিনী কুমার চক্রবর্তী, নিশিকান্ত সরকার, সতীশ চন্দ্র সরকার, দুর্গানাথ চক্রবর্তী প্রমুখ।
গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান
১১নং সেক্টরের অধীনে নেত্রকোনা জেলায় বেশ কিছু সম্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধ পরিচালিত হয়।
পাকবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করতে ডিনামাইট দিয়ে ঠাকুরাকোনা রেল সেতু উড়িয়ে দেওয়া হয়।
নাজিরপুর বাজারে পাকবাহিনীর সঙ্গে তীব্র সম্মুখ সংঘর্ষে সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন- ডা. আবদুল আজিজ, মো. ফজলুল হক, মো. ইয়ার মাহমুদ, ভবতোষ চন্দ্র দাস, মো. নূরুজ্জামান, দ্বিজেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস এবং মো. জামাল উদ্দিন। মুক্তিযোদ্ধারা শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং বহু পাকিস্তানি সৈন্য নিহত ও কিছু রাজাকারসহ কয়েকজন শত্রু বন্দী হয়।
মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারের পোশাকে ছদ্মবেশে থানা আক্রমণ করে ১২৫টি অস্ত্র দখল করেন।
মগড়া নদীকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চলে। প্লাটুন কমান্ডার আব্দুল কুদ্দুছ শহীদ হন। এটি ছিল এই অঞ্চলের অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
পাকবাহিনীর যোগাযোগ আরও বিচ্ছিন্ন করতে বাঘরা রেল সেতু ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহানের পরামর্শে নেত্রকোনা শহর আক্রমণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয়। কৃষি ফার্ম এলাকায় পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই সকালে দূর্গাপুরের বিরিশিরি থেকে কলমাকান্দায় পাকহানাদার ক্যাম্পে রসদ আসার খবর পান মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী কমান্ডার নাজমুল হক তারার নেতৃত্বে ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা ৩টি দলে বিভক্ত হয়ে নাজিরপুর বাজারের সকল প্রবেশ পথে এম্বুস করেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর পাকহানাদার বাহিনী না আসায় তাদের এম্বুস প্রত্যাহার করে তারা নিজ ক্যাম্পের পথে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে নাজিরপুর কাচারির কাছে পাকহানাদার বাহিনী তাদের উপর অতর্কিতে গুলি বর্ষণ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি করতে থাকেন। এক পর্যায়ে এই সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন ওই সাত মুক্তিযোদ্ধা।
তাঁদের এই আত্মত্যাগ নাজিরপুর যুদ্ধ দিবসকে আজও জাতির ইতিহাসে এক অনন্য স্মারক হিসেবে অমর করে রেখেছে।
যুদ্ধ শেষে শহীদদের লেংগুরার ফুলবাড়ী সীমান্তে গণেশ্বরী নদীর তীরে সমাহিত করা হয়।
চূড়ান্ত বিজয় ও শত্রু মুক্ত দিবস
৯ই ডিসেম্বর ১৯৭১
৮ই ডিসেম্বর: ৮ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনী ক্যাপ্টেন চৌহানের পরামর্শে মুক্তিযোদ্ধা আবু সিদ্দিক আহমদের নেতৃত্বে নেত্রকোণা শহর আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা দু’ভাবে বিভক্ত হয়েছিলেন। শহরের উত্তর দিক থেকে মিত্রবাহিনী আক্রমণ চালাবে। এতে পাকবাহিনী শহর থেকে দক্ষিণ দিক দিয়ে বেরিয়া ময়মনসিংহের রাস্তা ধরবে। সে সময় দক্ষিণ দিকে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ করবে। দক্ষিণ দিকে অবস্থানরত শ’তিনেক মুক্তিযোদ্ধা ওঁৎপেতে রয়েছে রাত থেকেই নেত্রকোণার কৃষি ফার্মে। রাত গড়িয়ে প্রায় ভোর, উত্তর দিকের আক্রমণের অপেক্ষায় দক্ষিণের মুক্তিযোদ্ধারা। এক পর্যায়ে আক্রমণ হলো পাক আর্মি পালানোর চেষ্টায় শহরের দক্ষিণ দিকে সরে এলো। শুরু হলো যুদ্ধ। বলতে গেলে সম্মুখ যুদ্ধ। সে যুদ্ধ হলো ৫/৬ ঘন্টা। মুক্তিযোদ্ধারা সে সময় প্রবলভাবে উত্তেজিত হয়ে যুদ্ধ করে চলেছেন। প্রবল উত্তেজনায় মুক্তিযোদ্ধারা অনেক সময় যুদ্ধের কৌশল ভেঙ্গে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন। অনেকে শত্রু নিধনে দৌড়ে এগোতে থাকেন। আহত হয়েছিলেন নেতৃত্বদানকারী মুক্তিযোদ্ধা আবু সিদ্দিক আহমেদ। আরো বেশি লোকক্ষয়ের আশঙ্কায় মুক্তিযোদ্ধারা পিছু সরলে পাকবাহিনীরা ময়মনসিংহের রাস্তা ধরে পালিয়ে যায়।
৯ই ডিসেম্বর: ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পাকহানাদার বাহিনী পূর্বধলা থেকে পালিয়ে যায়। একই দিনে শ্যামগঞ্জে পাকসেনাদের ব্রাশফায়ারে শহীদ হন তৎকালীন ইপিআর হাবিলদার সুধীর বড়ুয়া। পরদিন ৯ ডিসেম্বর সকালে গৌরীপুর থেকে ট্রেনে পূর্বধলায় প্রবেশের চেষ্টা করলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধে পাকসেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সময় তারা পাবই রেলসেতুটি মাইন বিস্ফোরণে ধ্বংস করে দেয়। পূর্বধলার এই যুদ্ধই ছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নেত্রকোনা জেলার শেষ যুদ্ধ। নেত্রকোনা পুরোপুরি শত্রু মুক্ত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়।
৮ ডিসেম্বর কৃষি ফার্মের যুদ্ধে যারা শহীদ হন:
- আবু খাঁ
- আব্দুস সাত্তার
- আব্দুর রশিদ
উপজেলাভিত্তিক হানাদার মুক্ত দিবস
নেত্রকোণা জেলার বিভিন্ন উপজেলা ধীরে ধীরে স্বাধীন হতে থাকে। একে একে পাকবাহিনীকে বিতাড়িত করে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিটি উপজেলায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দেন।
খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ
নেত্রকোনা জেলার সন্তান যারা সাহসিকতার জন্য রাষ্ট্রীয় খেতাব পেয়েছেন:
মুক্তিযুদ্ধের কোনো গল্প?
আপনার পরিবারের মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি, ছবি বা গল্প আমাদের সাথে শেয়ার করুন যেন আগামী প্রজন্ম এই ইতিহাস জানতে পারে।
জমা দিন →আপনার পাঠানো লেখা, ছবি কিংবা ভিডিও আমরা প্রকাশ করব ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে।
- ত্রিমোহনী গণহত্যা ও বধ্যভূমি | নেত্রকোনা | সংগ্রামের নোটবুক
- নেত্রকোনা জেলার বধ্যভূমি সমূহ - hasan_iqbal's bangla blog
- মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা | নেত্রকোণা জেলা জাতীয় তথ্য বাতায়ন
- মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনা সদর উপজেলা - সংগ্রামের নোটবুক
- মুক্তিযুদ্ধে পূর্বধলা উপজেলা - সংগ্রামের নোটবুক
- মুক্তিযুদ্ধে মোহনগঞ্জ উপজেলা - সংগ্রামের নোটবুক
- মুক্তিযোদ্ধার তালিকা - নেত্রকোণা জেলা জাতীয় তথ্য বাতায়ন
- শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নেত্রকোনা | Mukti Juddho Wiki | Fandom
- হাজারো শহীদের রক্তে মুক্ত হয় নেত্রকোনা - Dhakapost.com
- নাজিরপুর যুদ্ধ দিবস - কলমাকান্দা উপজেলা