নেত্রকোণার স্থাননাম

জেলা ও দশটি উপজেলার নামকরণের পেছনের গল্প। প্রতিটি নামের সঙ্গে মিশে আছে নেত্রকোণার বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কোনো নাম এসেছে ফার্সি থেকে, কোনোটি আরবি থেকে, কোনোটি ইংরেজ শাসনের ধ্বনি-পরিবর্তনের ফলে, আবার কোনোটি এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বা ইতিহাসের কোনো বিশেষ মুহূর্ত থেকে।

০১
নেত্রকোণা
পূর্বনাম: কালীগঞ্জনাটেরকোণা

নেত্রকোণার নামকরণের ইতিহাস শুধু একটি গ্রামের নামের পরিবর্তনের গল্প নয় এর সাথে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা, পাগলপন্থী বিদ্রোহের ধুলো-ওড়া ইতিহাস এবং ইংরেজ উচ্চারণের ধ্বনি-পরিবর্তনের এক অনন্য ভাষাতাত্ত্বিক যাত্রা।

প্রচলিত ও স্বীকৃত মত
নেত্রকোণা নামটি এসেছে নাটেরকোণা নামক গ্রামের নাম থেকে। গ্রামটির অবস্থান বর্তমান নেত্রকোণা জেলা শহরের উত্তরে, কংস নদের তীরে। 'পাগলপন্থী বিদ্রোহ' দমন করার উদ্দেশ্যে সপ্তদশ শতকের শেষভাগে ইংরেজ সরকার এই নাটেরকোণা নামক স্থানে প্রথম প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করে। এখান থেকে লেটিরকান্দা ও সুসঙ্গের অন্যান্য এলাকায় নৌপথে পুলিশি অভিযান পরিচালনা সহজ ছিল।

পরবর্তীতে নৌযোগাযোগের আরও সুবিধার্থে এবং পাগলপন্থীদের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে প্রশাসনিক কার্যক্রম নাটেরকোণা থেকে মৈমনসিংহ পরগণার কালীগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু বাস্তবে স্থানান্তর হলেও ইংরেজ সরকারের দাপ্তরিক পত্রযোগাযোগ চলতে থাকে নাটেরকোণা নামেই। ইংরেজদের উচ্চারণে ধ্বনি পরিবর্তিত হতে থাকে এবং কালক্রমে নাটেরকোণা বাংলায় নেত্রকোণা এবং ইংরেজিতে NETRAKONA রূপ পায়। আর চিরতরে বিলীন হয়ে যায় কালীগঞ্জের নাম।
নাটেরকোণা নেটেরকোণা নেতেরকোণা নেতরকোণা নেত্রকোণা
পাগলপন্থী বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন লেটিরকান্দার 'টিপু পাগলা'। এই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন তাঁর বাবা করিম শাহ ফকির — যিনি স্থানীয় আদিবাসী-হিন্দু-মুসলমান সবার নিকট সাধক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতা শের আলী গাজী ছিলেন শেরপুরের জমিদার তাঁর নামেই শেরপুর জেলার নামকরণ হয়েছে।
  • ১৭৬৩–১৮০০
    করিম শাহ ফকিরের নেতৃত্বে পাগলপন্থী আন্দোলনের প্রথম পর্যায়। ইংরেজ প্রশাসন নাটেরকোণায় প্রথম থানার কাজ শুরু করে।
  • ১৮১৫
    ময়মনসিংহ জেলায় চৌকিদারি ব্যবস্থা চালু। ইংরেজ কর্মকর্তা ড্যাম্পিয়ার কংস নদের তীরের নাটেরকোণায় থানার কাজ পরিচালনা করেন।
  • ১৮৮০
    নেত্রকোণা মহকুমায় পরিণত হয়। মহকুমার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৮৮২ সালে।
  • ১৭ জানুয়ারি ১৯৮৪
    নেত্রকোণা আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা হিসেবে ঘোষিত হয়।

০২
কলমাকান্দা

কলমাকান্দা নামটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত কলমা/কলমি এবং কান্দা। নামকরণের উৎস নিয়ে দুটি ভিন্ন মত প্রচলিত আছে। দুটি মতেই 'কান্দা' শব্দটি অভিন্ন এটি পাহাড়ি ঢলের পলিমাটিতে ভরাট হওয়া উঁচু ভূমিকে বোঝায়।

প্রথম মত: কলমিলতা থেকে
পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল ঢলের সঙ্গে মিশে থাকা পলিমাটি জমে এই অঞ্চল কালের পরিক্রমায় ভরাট ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এই ভরাট ভূমির স্থানীয় নাম "কান্দা"। এই কান্দায় প্রচুর পরিমাণে জন্ম নেয় কলমিলতা (Ipomoea aquatica)। ফলে স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত এই লতার নামানুসারে স্থানটি কলমিকান্দা এবং কালের আবর্তনে কলমাকান্দা রূপ লাভ করে।
কলমি + কান্দাকলমিকান্দাকলমাকান্দা
দ্বিতীয় মত: গারোদের কমলা বাণিজ্য থেকে
পাহাড়ে বসবাসকারী গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা গারো পাহাড় থেকে কমলা সংগ্রহ করে এই এলাকার অধিবাসীদের কাছে বিক্রি করতেন। এই কান্দা অঞ্চলটি তখন "কমলাকান্দা" নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে উচ্চারণের সামান্য পরিবর্তনে কমলাকান্দা হয়ে যায় কলমাকান্দা
কমলা + কান্দাকমলাকান্দাকলমাকান্দা

০৩
দুর্গাপুর
পূর্বনাম: সুসংসুসঙ্গ

দুর্গাপুর এর পূর্ব নাম সুসং এটি এখনও সুসং দুর্গাপুর নামেই সমধিক পরিচিত। এই নামের সাথে জড়িয়ে আছে একজন রাজার রাজ্য স্থাপনের কাহিনি, মোঘল সম্রাটের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং একটি অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমার যাত্রার অসাধারণ ইতিহাস।

সুসং নামের উৎপত্তি
সুসং শব্দটি মূলত 'সু-সঙ্গ'-এর পরিবর্তিত রূপ। ধারণা করা হয়, সোমেশ্বর পাঠক (মতান্তরে সোমনাথ পাঠক) ভারতের কান্যকুব্জ থেকে ১২৮০ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব ময়মনসিংহের উত্তরভাগ 'পাহাড় মুল্লুকে' সঙ্গীসাথীসহ আগমন করেন। তিনি সেখানকার অত্যাচারী রাজাকে যুদ্ধে পরাস্ত করেন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সু-সঙ্গ অর্থাৎ ভালো সঙ্গ - নামে একটি স্বাধীন ও শান্তিপূর্ণ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
সু-সঙ্গ (ভালো সঙ্গ)সুসঙ্গসুসং
দুর্গাপুর নামের উৎপত্তি - দুর্গাপ্রতিমার যাত্রা
এই রাজবংশের রাজা রঘুনাথ সিংহ মোঘল সম্রাট মহামতি আকবরের সাথে একটি চুক্তি করেন। চুক্তির অংশ হিসেবে রাজা রঘুনাথ সিংহ সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ-এর পক্ষাবলম্বন করেন। যুদ্ধে বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদ রায় ও কেদার রায় পরাজিত হলে রাজা রঘুনাথ সেখান থেকে অষ্টধাতু নির্মিত একটি দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে আসেন এবং রাজমন্দিরে স্থাপন করেন। এই দুর্গাপ্রতিমার আগমনের স্মৃতিতেই সময়ের পরিক্রমায় এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় সুসং দুর্গাপুর
সোমেশ্বর পাঠক যে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার নাম ছিল 'সু-সঙ্গ' ভালো সঙ্গ। সেই নামেই আজও বেঁচে আছে সুসং দুর্গাপুর।

০৪
বারহাট্টা
পূর্ব উৎস: ব্রাহাট্টা (Brahatta)

বারহাট্টার নামকরণের সাথেও জড়িয়ে আছে পাগলপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস। দুটি পুরনো গ্রামের নাম এবং ইংরেজদের সামরিক উপস্থিতি একত্রিত হয়ে তৈরি হয়েছে এই নাম।

প্রচলিত ও স্বীকৃত মত
বারহাট্টা শব্দটি এসেছে বরোহাটি এবং বৌহাটি নামের দুটি গ্রামের নাম থেকে। পাগলপন্থী বিদ্রোহীদেরকে প্রতিহত করতে ইংরেজ সরকার এই দুই গ্রামের অদূরে সেনাছাউনি গড়ে তোলে। সেনাছাউনি স্থাপিত স্থানটির নাম দেওয়া হয় ব্রাহাট্টা (Brahatta)। পরবর্তীতে ব্রাহাট্টা নামটি স্থানীয় উচ্চারণে বারহাট্টা নামে পরিচিতি পায়।
বরোহাটি + বৌহাটিBrahattaব্রাহাট্টাবারহাট্টা
এখনও বারহাট্টা রেলস্টেশনের নামফলকটি ইংরেজিতে Brahatta লেখা আছে, পুরনো নামের নীরব স্মৃতি বহন করে চলছে সেই ফলক।

০৫
পূর্বধলা

পূর্বধলার নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি স্বচ্ছ বিলের গল্প এবং জমিদারি আভিজাত্যের ছাপ। 'ধলা' শব্দটি এই নামের প্রাণকেন্দ্র।

প্রচলিত মত: রাজধলা বিল থেকে
পূর্বধলা নামটি এসেছে এই এলাকায় অবস্থিত 'রাজধলা' নামক বিলের নাম থেকে। বিলটির আয়তন প্রায় ১৩০ একর। স্থানীয়ভাবে 'ধলা' শব্দটি সাদা বা স্বচ্ছ অর্থে ব্যবহৃত হয়। এই বিল কচুরিপানা ও আবর্জনামুক্ত থাকায় পানি ছিল স্বচ্ছ ও সুপেয় — ফলে বিলটি ধলা বিল নামে পরিচিতি পায়। পরে জমিদারি সংরক্ষণের কারণে বিলের নামের সাথে যুক্ত হয়ে যায় 'রাজ' শব্দটি। এই রাজধলা বিলের পূর্ব দিকের এলাকাই পুবধলা বা পূর্বধলা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
ধলা বিল (স্বচ্ছ জল)রাজধলা বিলপুবধলাপূর্বধলা

০৬
কেন্দুয়া

কেন্দুয়ার নামকরণ নিয়ে দুটি স্বতন্ত্র মত রয়েছে: একটি আরবি ভাষার প্রেক্ষাপটে, অন্যটি ফার্সি ভাষার প্রেক্ষাপটে।

প্রথম মত: ইয়েমেনের 'কেন্দা' থেকে আগত দরবেশের নামানুসারে
আরব ইয়েমেনের অন্তর্গত 'কেন্দা' নামক স্থান থেকে একজন ধর্মপ্রচারক দরবেশ কেন্দুয়ায় আসেন। তিনি কান্দাপাড়া, কেন্দুয়া ও বিপ্রবর্গ এই তিনটি গ্রামে দীর্ঘকাল ধর্ম প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর সাথে পরিচিত মানুষ তাঁকে তাঁর আসার দেশ 'কেন্দা'-র নামে চিনত। কালক্রমে সেই 'কেন্দা' শব্দটি বিকৃত হয়ে কেন্দুয়া নামের উদ্ভব হয়।
কেন্দা (ইয়েমেন)কেন্দুয়া
দ্বিতীয় মত: ফার্সি 'কান্দওয়া' (সবুজ ভূমি) থেকে
মুঘল ও সুলতানি শাসনকালে কেন্দুয়ায় ফার্সিভাষী মানুষের নিয়মিত আনাগোনা ছিল। কেন্দুয়া অঞ্চল ছিল সবুজে ঘেরা। ফলে ফার্সিভাষীরা এই অঞ্চলটিকে 'কান্দওয়া' বলে সম্বোধন করতেন। 'কান্দওয়া' শব্দটি ফার্সি এর অর্থ সবুজ ভূমি। সেই ফার্সি 'কান্দওয়া' থেকে উচ্চারণ পরিবর্তিত হয়ে কেন্দুয়া নামের উদ্ভব ঘটে।
কান্দওয়া (ফার্সি = সবুজ ভূমি)কেন্দুয়া
ঐতিহ্যবাহী রোয়াইলবাড়ী দুর্গ : বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা কেন্দুয়া উপজেলায় অবস্থিত। সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ, নছরত শাহ এবং ঈশা খাঁর স্মৃতিধন্য এই রোয়াইলবাড়ির মাটি। 'রোয়াইল' একটি আরবি শব্দ — এর অর্থ ক্ষুদ্র অশ্বারোহী বাহিনী।

০৭
আটপাড়া
পূর্বনাম: ব্রুজের বাজারহাটপাড়া

আটপাড়ার নামকরণ একটি দুই-স্তরীয় যাত্রা — প্রথমে এলাকার নাম ছিল 'ব্রুজের বাজার', তারপর পাশের হাটপাড়া থেকে এলো আজকের 'আটপাড়া'।

প্রথম মত: ব্রুজ ফকিরের নামানুসারে 'ব্রুজের বাজার'
ব্রুজ ফকির নামে এক সুফি সাধকের নামানুসারে এই এলাকায় 'ব্রুজের বাজার' নামের সূচনা হয়েছিল বলে একটি মত প্রচলিত আছে। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
দ্বিতীয় মত: জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোরের নামানুসারে
ময়মনসিংহ পরগণার জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর নামানুসারে এই এলাকায় ব্রজের বাজার গড়ে ওঠে এবং পরে তা ব্রুজের বাজার নাম পায়।
আটপাড়া নামের চূড়ান্ত উৎপত্তি
ব্রুজের বাজারের পাশেই মোবারকপুর নামক মৌজায় হাট বসতো। সেই হাটকে কেন্দ্র করে জেলেদের বসতি গড়ে ওঠে - এলাকাটিকে 'হাটপাড়া' নামে ডাকা হত। স্থানীয় উচ্চারণে 'হাট' শব্দটিকে 'আট'ও বলা হয়ে থাকে। এই 'হাটপাড়া' থেকেই জন্ম নেয় আজকের আটপাড়া
হাটপাড়াআটপাড়া

০৮
মদন

মদনের নামের উৎস নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ফার্সি ভাষার প্রভাবই এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে কারণ ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত এই এলাকায় ফার্সিই ছিল রাষ্ট্রীয় ভাষা।

প্রথম মত: ভূস্বামী মদনার নামানুসারে
কথিত আছে, মদনা নামে জনৈক ভূস্বামীর নামানুসারে এই এলাকার নাম মদন হয়েছে। তবে এই মতের সমর্থনে বিস্তারিত ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় মত: ফার্সি 'মুদন' থেকে (অধিক গ্রহণযোগ্য)
বেশির ভাগের মতে, পারস্যবাসীদের এ অঞ্চলে আগমনকালে মুদন বা মদন নামের উদ্ভব হয়েছে। ফার্সি শব্দ 'মুদন'-এর অর্থ শহর বা নগর। সময়ের আবর্তনে 'মুদন' শব্দটি বদলে গিয়ে মদন নামে পরিচিতি পেয়েছে।
মুদন (ফার্সি = শহর)মদন
ইংরেজ সরকার কর্তৃক ১৮৩৭ সালে নিষিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত এই এলাকার রাষ্ট্রীয় কাজে ফার্সি ভাষা ব্যবহৃত হত তাই ফার্সি শব্দ থেকে নামের উৎপত্তির যুক্তিটি অনেক বেশি শক্তিশালী।

০৯
মোহনগঞ্জ

মোহনগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস একটি সুন্দর মানবিক গল্প। এক সাধারণ ব্যবসায়ীর স্বপ্ন, একজন জমিদারের উদারতা এবং একটি হাটের জন্ম।

প্রচলিত ও স্বীকৃত মত
মোহনগঞ্জ নামকরণটি হয়েছে মোহন সাহা নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর নাম থেকে। জমিদারি শাসনামলে হয়বতনগরের জমিদার শরীফ খাঁ তাঁর জমিদারির খোঁজ-খবর নিতে এই এলাকায় আসেন। মোহন সাহা জমিদারের আগমন উপলক্ষ্যে কিছু সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য নিয়ে হাজির হন।

আতিথেয়তায় মুগ্ধ জমিদার মোহন সাহার কাছে জানতে চান তাঁর কোনো অভিলাষ আছে কিনা। মোহন সাহা তখন তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেন যে স্থানটিতে বসে তিনি ব্যবসা করেন সেখানে একটি হাট বসাতে চান। জমিদার শরীফ খাঁ সাদরে অনুমতি প্রদান করেন। স্থানীয়দের মধ্যে সেটি মোহন সাহার হাট বলে পরিচিতি পায় এবং ধীরে ধীরে মোহনগঞ্জ নামে খ্যাত হয়।
মোহন সাহার হাটমোহনগঞ্জ

১০
খালিয়াজুরী
পূর্ব মত: খাসিয়াজুরী

হাওরবেষ্টিত এই উপজেলার নামকরণ নিয়ে তিনটি ভিন্ন মত রয়েছে। তৃতীয় মতটি ভৌগোলিক বাস্তবতার সাথে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ঐতিহাসিকদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য।

প্রথম মত: খাসিয়া সম্প্রদায়ের বসবাস থেকে
এক জনশ্রুতি অনুসারে, এ অঞ্চলে খাসিয়াদের বাস ছিল। সে কারণে এলাকার নামকরণ হয়েছিল খাসিয়াজুরী। কালক্রমে উচ্চারণ পরিবর্তিত হয়ে তা খালিয়াজুরীতে রূপান্তরিত হয়। তবে এই মতের সমর্থনে ঐতিহাসিক দলিলে খুব জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় মত: জোর করে দখল থেকে
আরেকটি জনশ্রুতি অনুসারে, গারো, হাজং ও কোচ শাসকদের হাত থেকে খাসিয়া সম্প্রদায় 'জোর' করে এই অঞ্চলের দখল নিয়েছিল। তাই নাম হয় খাসিয়াজুরী এবং পরে খালিয়াজুরী
তৃতীয় মত: খাল ও জুরি থেকে (অধিক গ্রহণযোগ্য)
পানি চলাচলের জন্য সৃষ্ট নালাকে স্থানীয়ভাবে 'জুরি' বলে অভিহিত করা হয়। হাওরবেষ্টিত খালিয়াজুরী উপজেলায় ছোটবড় অনেক খাল রয়েছে। এই মতানুসারে খাল এবং জুরি একত্রিত হয়ে খালিয়াজুরী নামটির উৎপত্তি হয়েছে। এই ব্যাখ্যাটি ভৌগোলিক বাস্তবতার সাথে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
খাল (জলধারা)+জুরি (নালা)খালিয়াজুরী
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য স্থানের নামকরণ
রোয়াইলবাড়ি
কেন্দুয়া
রোয়াইল একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ ক্ষুদ্র অশ্বারোহী বাহিনী। সুতরাং রোয়াইলবাড়ি মানে দাঁড়ায় 'অশ্বারোহী বাহিনীর বাড়ি'। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কামরূপ রাজ্য দখল করার পর তাঁর পুত্র নছরত শাহকে কামরূপের শাসক নিযুক্ত করেন। প্রবল বন্যা এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখে নছরত শাহ কামরূপ থেকে পালিয়ে রোয়াইলবাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। নছরত শাহের নামানুসারে এই পরগণার নাম হয় 'নছরৎ-ও-জিয়াল' এবং সমগ্র পরগণা 'নছরৎসাহী' নামে পরিচিতি পায়।

রানী খং মিশন
দুর্গাপুর
গারো ভাষায় 'খং' শব্দের অর্থ গর্ত। মিথ অনুযায়ী সোমেশ্বরী নদীর তীরের এই পাহাড়ের নিচে একটি বিশাল গর্ত বা সুড়ঙ্গ ছিল। সেই সুড়ঙ্গে বংশপরম্পরায় দৈত্যাকার রানী কুমির বাস করত। এই 'রানীর গর্ত' বা রানী খং থেকেই পাহাড়ের নাম হয় রানী খং এবং এই পাহাড়ের উপরে অবস্থিত মিশনটি রানী খং মিশন নামে পরিচিতি লাভ করে।

মদনপুর
নেত্রকোণা সদর
পাল শাসিত আসামের অধীনে একটি জেলার সদর দপ্তর ছিল মদনপুর, দায়িত্বে ছিলেন সামন্তরাজের কর্মচারী মদন মোহন কোচ। ১০৩৮ খ্রিষ্টাব্দে পালরাজ প্রথম মহীপালের মৃত্যুর পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার সুযোগে মদন মোহন কোচ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১০৫৪ খ্রিষ্টাব্দে হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দীন রুমী (রাহ.) ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসেন এবং মদনপুরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করেন। তাঁর সম্মানার্থে এলাকার নামকরণ করেন মদনপুর

হাওর নামের উৎপত্তি
আঞ্চলিক ভাষা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন 'সাগর' শব্দটি আঞ্চলিক উচ্চারণে পরিবর্তিত হতে হতে হাওর হয়েছে। বর্ষায় হাওর ও নদীর সীমানা একাকার হয়ে বিশাল দিগন্তবিহীন সমুদ্রের মতো দেখায়।
সাগরসায়রহাওর

পেতনি বিল ও ভুড়ভুড়িয়া বিল
লোক-নামকরণ
মাটিতে মিশে যাওয়া জৈব দ্রব্য পচে মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। পানির মধ্য দিয়ে উঠে আসা এই গ্যাস বুদবুদ বা ভুড়ভুড়ি তৈরি করে — তাই নাম ভুড়ভুড়িয়া বিল। আবার শুষ্ক মৌসুমে কাদামাটি থেকে বের হওয়া গ্যাস বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে রাতের বেলা আগুনের শিখা তৈরি করে। প্রাকৃতিক এই আলেয়াকে স্থানীয়রা পেতনির (ভূত-পেতনি) কারসাজি মনে করতেন তাই নাম পেতনি বিল

বাইদ্যার হাওর ও পাঙ্গাসিয়া হাওর
স্বতঃস্ফূর্ত নামকরণ
বাইদ্যার হাওর বেদে (বাইদ্যা) সম্প্রদায়ের নিয়মিত আনাগোনা ও অস্থায়ী বসবাস থেকেই এই নামকরণ। মৈমনসিংহ গীতিকার 'মহুয়া' পালায় এই এলাকার উল্লেখ রয়েছে।

পাঙ্গাসিয়া হাওর প্রাকৃতিক পাঙ্গাশ মাছের রাজকীয় বিচরণক্ষেত্র হওয়ায় মৎস্যজীবীদের কাছে এই হাওরটি বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। সেই পরিচিতি থেকেই নাম হয় পাঙ্গাসিয়া হাওর।

গোমড়ার হাওর
স্বভাব-নামকরণ
গোমড়া শব্দের আভিধানিক অর্থ গম্ভীর, মলিন বা মুখ ভার করা। এই হাওরের আবহাওয়ায় সার্বক্ষণিক গুমোটভাব বিরাজ করে এবং শান্ত চেহারা হঠাৎ ভয়ঙ্কর রূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। সেই রহস্যময় ও অনিশ্চিত স্বভাব থেকেই নাম গোমড়ার হাওর

বাঘরার হাওর
আটপাড়া
মৈমনসিংহ গীতিকার 'দেওয়ান ভাবনা' পালায় বর্ণিত - দেওয়ানের গুপ্তচর বাঘরা বিভিন্ন স্থানের সুন্দরী নারীদের সংবাদ দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে লাখেরাজ সম্পত্তি হিসেবে একটি হাওর পান। সেই থেকে হাওরটি বাঘরার হাওর নামে পরিচিত। নেত্রকোণা থেকে দশমাইল দক্ষিণ-পূর্বে আটপাড়া উপজেলায় এই হাওর অবস্থিত।

নছরৎসাহী পরগণা
ঐতিহাসিক পরগণা
রোয়াইলবাড়িতে আশ্রয় গ্রহণকারী নছরত শাহের নামানুসারে এই পরগণার নাম হয় 'নছরৎ-ও-জিয়াল'। সময়ের সাথে সমগ্র পরগণা 'নছরৎসাহী' নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে বার ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁ কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি ও নেত্রকোণার রোয়াইলবাড়ি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন।
তথ্যসূত্র
গ্রন্থ: নেত্রকোণার নামকাহন — মঈনউল ইসলাম
Masud Hasan নেত্রকোণা জেলার ১০টি উপজেলার নামকরণের ইতিহাস
প্রাতিষ্ঠানিক উৎস: বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন
বিশ্বকোষ: বাংলা পিডিয়া
গ্রন্থমালা: বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত "বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা: নেত্রকোণা"
ঐতিহাসিক গ্রন্থ: কেদারনাথ মজুমদার — ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ
নবীনতর পূর্বতন