জেলা ও দশটি উপজেলার নামকরণের পেছনের গল্প। প্রতিটি নামের সঙ্গে মিশে আছে নেত্রকোণার বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কোনো নাম এসেছে ফার্সি থেকে, কোনোটি আরবি থেকে, কোনোটি ইংরেজ শাসনের ধ্বনি-পরিবর্তনের ফলে, আবার কোনোটি এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বা ইতিহাসের কোনো বিশেষ মুহূর্ত থেকে।
নেত্রকোণার নামকরণের ইতিহাস শুধু একটি গ্রামের নামের পরিবর্তনের গল্প নয় এর সাথে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা, পাগলপন্থী বিদ্রোহের ধুলো-ওড়া ইতিহাস এবং ইংরেজ উচ্চারণের ধ্বনি-পরিবর্তনের এক অনন্য ভাষাতাত্ত্বিক যাত্রা।
পরবর্তীতে নৌযোগাযোগের আরও সুবিধার্থে এবং পাগলপন্থীদের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে প্রশাসনিক কার্যক্রম নাটেরকোণা থেকে মৈমনসিংহ পরগণার কালীগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু বাস্তবে স্থানান্তর হলেও ইংরেজ সরকারের দাপ্তরিক পত্রযোগাযোগ চলতে থাকে নাটেরকোণা নামেই। ইংরেজদের উচ্চারণে ধ্বনি পরিবর্তিত হতে থাকে এবং কালক্রমে নাটেরকোণা বাংলায় নেত্রকোণা এবং ইংরেজিতে NETRAKONA রূপ পায়। আর চিরতরে বিলীন হয়ে যায় কালীগঞ্জের নাম।
- ১৭৬৩–১৮০০করিম শাহ ফকিরের নেতৃত্বে পাগলপন্থী আন্দোলনের প্রথম পর্যায়। ইংরেজ প্রশাসন নাটেরকোণায় প্রথম থানার কাজ শুরু করে।
- ১৮১৫ময়মনসিংহ জেলায় চৌকিদারি ব্যবস্থা চালু। ইংরেজ কর্মকর্তা ড্যাম্পিয়ার কংস নদের তীরের নাটেরকোণায় থানার কাজ পরিচালনা করেন।
- ১৮৮০নেত্রকোণা মহকুমায় পরিণত হয়। মহকুমার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৮৮২ সালে।
- ১৭ জানুয়ারি ১৯৮৪নেত্রকোণা আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা হিসেবে ঘোষিত হয়।
কলমাকান্দা নামটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত কলমা/কলমি এবং কান্দা। নামকরণের উৎস নিয়ে দুটি ভিন্ন মত প্রচলিত আছে। দুটি মতেই 'কান্দা' শব্দটি অভিন্ন এটি পাহাড়ি ঢলের পলিমাটিতে ভরাট হওয়া উঁচু ভূমিকে বোঝায়।
দুর্গাপুর এর পূর্ব নাম সুসং এটি এখনও সুসং দুর্গাপুর নামেই সমধিক পরিচিত। এই নামের সাথে জড়িয়ে আছে একজন রাজার রাজ্য স্থাপনের কাহিনি, মোঘল সম্রাটের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং একটি অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমার যাত্রার অসাধারণ ইতিহাস।
বারহাট্টার নামকরণের সাথেও জড়িয়ে আছে পাগলপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস। দুটি পুরনো গ্রামের নাম এবং ইংরেজদের সামরিক উপস্থিতি একত্রিত হয়ে তৈরি হয়েছে এই নাম।
পূর্বধলার নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি স্বচ্ছ বিলের গল্প এবং জমিদারি আভিজাত্যের ছাপ। 'ধলা' শব্দটি এই নামের প্রাণকেন্দ্র।
কেন্দুয়ার নামকরণ নিয়ে দুটি স্বতন্ত্র মত রয়েছে: একটি আরবি ভাষার প্রেক্ষাপটে, অন্যটি ফার্সি ভাষার প্রেক্ষাপটে।
আটপাড়ার নামকরণ একটি দুই-স্তরীয় যাত্রা — প্রথমে এলাকার নাম ছিল 'ব্রুজের বাজার', তারপর পাশের হাটপাড়া থেকে এলো আজকের 'আটপাড়া'।
মদনের নামের উৎস নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ফার্সি ভাষার প্রভাবই এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে কারণ ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত এই এলাকায় ফার্সিই ছিল রাষ্ট্রীয় ভাষা।
মোহনগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস একটি সুন্দর মানবিক গল্প। এক সাধারণ ব্যবসায়ীর স্বপ্ন, একজন জমিদারের উদারতা এবং একটি হাটের জন্ম।
আতিথেয়তায় মুগ্ধ জমিদার মোহন সাহার কাছে জানতে চান তাঁর কোনো অভিলাষ আছে কিনা। মোহন সাহা তখন তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেন যে স্থানটিতে বসে তিনি ব্যবসা করেন সেখানে একটি হাট বসাতে চান। জমিদার শরীফ খাঁ সাদরে অনুমতি প্রদান করেন। স্থানীয়দের মধ্যে সেটি মোহন সাহার হাট বলে পরিচিতি পায় এবং ধীরে ধীরে মোহনগঞ্জ নামে খ্যাত হয়।
হাওরবেষ্টিত এই উপজেলার নামকরণ নিয়ে তিনটি ভিন্ন মত রয়েছে। তৃতীয় মতটি ভৌগোলিক বাস্তবতার সাথে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ঐতিহাসিকদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য।
পাঙ্গাসিয়া হাওর প্রাকৃতিক পাঙ্গাশ মাছের রাজকীয় বিচরণক্ষেত্র হওয়ায় মৎস্যজীবীদের কাছে এই হাওরটি বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। সেই পরিচিতি থেকেই নাম হয় পাঙ্গাসিয়া হাওর।