নেত্রকোণার বারুণী মেলা

নেত্রকোণার বারুণী মেলা

নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা আর যান্ত্রিকতার মাঝে বারুণী মেলা যেন এক টুকরো শৈশবের আশ্রয়। মেলার বাঁশির সুর, টমটমগাড়ির ঝংকার আর মানুষের আনন্দধ্বনি মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলোর কাছে। দূর থেকে ভেসে আসে বাঁশি, ভেঁপু আর নানা বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। মেলা শেষে শিশুদের হাতে দেখা যায় মাটির পুতুল, পালকি, ষাঁড়, গরু, হাতি, ঘোড়া কিংবা বিচিত্র সব খেলনা। কারও হাতে খই, কারও হাতে মুড়ি, বাতাসা। এসব নিয়েই বাড়ির পথে ছোটে তারা। আমাদের শৈশবেও বারুণী মেলা ছিল বছরের অন্যতম প্রতীক্ষিত উৎসব। সামান্য কিছু পয়সা হাতে নিয়ে মেলার প্রতিটি দোকান ঘুরে বেড়াতাম। ছোট্ট সেই পুঁজিতেই মনে হতো, মেলার সব আনন্দ বুঝি আমাদেরই জন্য অপেক্ষা করছে। বড়বাজারের প্রাচীন বটগাছের নিচে কালীমন্দিরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই আয়োজন আজও সেই আনন্দের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

এই মেলার সূচনা ঠিক কবে, তা নির্দিষ্ট করে বলার মতো কোনো তথ্য নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলা তার নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে টিকে আছে। নদীতীরবর্তী এই আয়োজনের নাম বারুণী মেলা। বারুণী নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গঙ্গার পৌরাণিক পরিচয় এবং ধর্মীয় বিশ্বাস। চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে শতভিষা নক্ষত্রের সংযোগকে বারুণী তিথি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই পবিত্র দিনেই জাদুকাটা নদীতে অনুষ্ঠিত হয় পণাতীর্থের স্নান। পূর্ণতীর্থ থেকে পণাতীর্থ নামটির উদ্ভব হয়েছে বলেও ধারণা করা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই স্নান আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতার প্রতীক। বারুণী মেলার উৎসব শেষ হতে না হতেই বসে অষ্টমী মেলা। তখনও বটগাছের নিচের মেলাপ্রাঙ্গণ মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। একই উৎসবের আবেশ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।

শৈশবের সেই মেলায় পালশিল্পীদের উপস্থিতি ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ। তাঁদের হাতে তৈরি মাটির খেলনা আমাদের কাছে ছিল অমূল্য সম্পদ। মাটির তৈরি ছোট্ট পুতুল কিংবা টমটমগাড়ি হাতে পাওয়ার আনন্দ আজও স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল। মেলার পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, যেন সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে আবার ফিরে এসেছি সেই শৈশবে। মেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসে বিচিত্র সব পণ্য। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাঁদের পসরা সাজিয়ে বসেন, চলে কেনাবেচা। তবে মেলার বিশেষ আকর্ষণ বিন্নি ধানের খই। পাশাপাশি গুড়ের বাতাসা, উখড়া ও নানা ধরনের খেলনা কিনতে মানুষের ভিড় জমে। মেলার আনন্দ যেন শুধু কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনেও এর পূর্ণতা।

মেলার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, পালশিল্পীদের ঐতিহ্য এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। মাটির শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোই যুগের পর যুগ ধরে বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নেত্রকোনার বিভিন্ন স্থানে এখনো পালশিল্পীরা বসবাস করেন। মাটির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কেবল জীবিকার নয়, বরং উত্তরাধিকার ও সংস্কৃতিরও। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ মাটি হয়ে ওঠে শিশুদের আনন্দের উপকরণ, গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি।

পালশিল্পীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁদের জীবনসংগ্রাম, পেশার প্রতি ভালোবাসা এবং ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা। তাঁরা বিভিন্ন মেলায় ঘুরে ঘুরে মাটির খেলনা বিক্রি করেন। শিশুদের হাতে টমটমগাড়ি কিংবা অন্যান্য খেলনা তুলে দিতে পারার মধ্যেই তাঁরা খুঁজে পান আনন্দ ও তৃপ্তি। তবে তাঁদের কথায় মিশে থাকে এক ধরনের উদ্বেগ। সময়ের পরিবর্তনে মাটির খেলনার চাহিদা কমে যাচ্ছে, নতুন প্রজন্মও এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন জাগে, একদিন কি হারিয়ে যাবে মাটির এই চিরচেনা ঐতিহ্য?

নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাংলার জনপদ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিস্তার। নদীর সঙ্গে মানুষের জীবন যেমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তেমনি জড়িয়ে আছে তার লোকজ ঐতিহ্যও। নদী যখন তার প্রাণ হারায়, তখন তার তীরের সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে। এই হারিয়ে যাওয়া এক মুহূর্তের ঘটনা নয়; সময়ের দীর্ঘ প্রবাহে তা ঘটে নীরবে। বারুণী মেলার মতো আয়োজন তাই কেবল একটি উৎসব নয়, বরং নদীকেন্দ্রিক বাংলার ইতিহাস, স্মৃতি ও সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

তথ্যসূত্র: নেত্রকোনার বড়বাজারের বারুণী মেলা - সরোজ মোস্তফা


নবীনতর পূর্বতন