গারো পাহাড়ের ঝর্ণা থেকে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত নেত্রকোনার বুকজুড়ে বয়ে চলা অগণিত নদীর গল্প। নেত্রকোনা জেলা নদী ও হাওড় বেষ্টিত। এর বুকচিড়ে বয়ে চারদিক থেকে উপজেলাগুলোকে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন নদী ও হাওড়।
গারো পাহাড়ের ঝর্ণাধারা থেকে জন্ম নিয়ে সোমেশ্বরী, কংস ও মগড়ার মতো নদীগুলো এ জেলার জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে গড়ে তুলেছে যুগের পর যুগ ধরে। মানব সভ্যতার বিকাশ থেকে শুরু করে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি — সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এসব নদ-নদী।
প্রথম প্রধান নদী
সোমেশ্বরী নদী
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝর্ণাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে রমফা নদীর স্রোতধারা একত্রিত হয়ে সোমেশ্বরীর সৃষ্টি। ৬৮৬ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে সোমেশ্বর পাঠক নামে এক সিদ্ধপুরুষ অত্রাঞ্চল দখল করার পর থেকে নদীটি সোমেশ্বরী নামে পরিচিত। গারোরা আবার এটিকে সিমসাং নামে ডাকেন। মেঘালয়ের বাঘমারা বাজার হয়ে রাণীখং পাহাড়ের কাছ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে শিবগঞ্জ, কুমুদগঞ্জ, কোনাপাড়া, বাকলজোড়া, সিধলি, কলমাকান্দা, মধ্যনগর হয়ে ধনু নদীতে মিলিত হয়েছে।
১৯৬২ সালে পাহাড়ি ঢলে সোমেশ্বরী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে নতুন গতিপথ তৈরি করে, যা স্থানীয়ভাবে শিবগঞ্জ ঢালা নামে খ্যাত। বর্তমানে এটিই সোমেশ্বরীর মূল স্রোতধারা। এ ধারাটি চৈতালি হাওর হয়ে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল বাজারের পশ্চিম দিয়ে কংস নদীতে মিলিত হয়েছে।
১৯৮৮ সালের পাহাড়ি ঢলে সোমেশ্বরী থেকে আত্রাখালি নামে শাখা নদীর সৃষ্টি হয়। ২০১৪ সালের বন্যার পর আত্রাখালি থেকে নয়া গাঙ নামে আরেকটি ধারার জন্ম। আরও ভাটিতে সোমেশ্বরীর শাখা নদী তৈরি হয়েছে গুনাই, বালিয়া ও খারপাই।
এই নদীতেই একসময় পাওয়া যেত সোনালি রঙের বিরল মহাশোল মাছ। দুর্গাপুরে মহাশোল মাছ দিয়েই অতিথিদের আপ্যায়ন করার রীতি ছিল। নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে পানির প্রবাহ প্রায় নেই বললেই চলে — তাই এই মাছ এখন আর পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় প্রধান নদী · সবচেয়ে দীর্ঘ
মগড়া নদী
ব্রহ্মপুত্র থেকে সেনেরচরের খড়িয়া নদী বেয়ে ময়মনসিংহের ফুলপুরের বুড়বুড়িয়া বিলে পতিত হয়। সেখান থেকে গজারিয়া ও রাংসার স্রোতের সঙ্গে মিলিত হয়ে ফুলপুরের ঢাকুয়া দিয়ে পূর্বদিকে ধলাই নামে প্রবাহিত হয়। পূর্বধলার হোগলা বাজার হয়ে ত্রিমোহনীতে এসে লাউয়ারী নদীর সঙ্গে মিলে মগড়া নাম ধারণ করে। সেখান থেকে পাঁচ মাইল দক্ষিণে নেমে দয়াগঞ্জ ঘাট থেকে পূর্ব দিকে আঁকাবাঁকা হয়ে নেত্রকোনা শহরের পাশ দিয়ে আটপাড়া, মদন হয়ে ধনু নদীতে পতিত হয়েছে।
নেত্রকোনা জেলায় মগড়া নদীর গতিপথ সবচেয়ে বেশি। নদীটি কোথাও ধলাই, কোথাও মগড়া নামে খ্যাত। মগড়া ও কংস নদী ৮-১০ মাইল ব্যবধানে প্রায় ৪০ মাইল সমান্তরালভাবে পূর্ব দিকে প্রবাহিত। বিভিন্ন স্থানে মগড়ায় মিলিত হয়েছে লাউয়ারী, ধলাই, কংসের শাখা, সাইডুলি ও পাটকুড়া নদী।
পশ্চিম দিক থেকে শ্যামগঞ্জ হয়ে দয়াগঞ্জ ঘাটের কাছে মগড়ার সঙ্গে ধলাই নামের একটি স্রোতধারা মিলিত হয়েছে। ঠাকুরাকোণা থেকে কংস নদীর একটি শাখা আটপাড়ায় মগড়ায় মিলিত হয়েছে। গৌরীপুর দিক থেকে আসা পাটকুড়া নদী বসুর বাজার এলাকায় মগড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তৃতীয় প্রধান নদী
কংস নদী
ভারতের তুরা পাহাড়ে বিভিন্ন ঝর্ণার সম্মিলনে কংস নদীর উৎপত্তি। উৎপত্তিস্থল থেকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী পর্যন্ত এ নদীর নাম ভূগাই। নালিতাবাড়ীর ৫ মাইল ভাটিতে দিংঘানা, চেল্লাখালী, দেওদিয়া, মারিসি, মলিজি নামে উপনদীগুলো ভূগাইয়ে মিলিত হয়। ফুলপুরের পর থেকে নদীটি কংস নামে পরিচিত। মেঘালয় থেকে নিতাই নদী শঙ্করপুরের কাছে কংসে মিলিত হয়েছে — এতে কংস অনেকটা বেড়ে গেছে।
পূর্বধলার সীমানায় কংস থেকে কালিহর শাখা নদী দক্ষিণে ছুটে গিয়ে ধলাইয়ে মিলিত হয়েছে। কালিহরের শাখা খানিগাঙ একসময় খরস্রোতা ছিল — এখন মরাগাঙ। জারিয়া বাজারের পূর্বদিক দিয়ে শলাখালী শাখা বেরিয়ে ত্রিমোহনীতে মগড়ায় পতিত হয়। ঠাকুরাকোণা বাজারের পাশ দিয়ে দক্ষিণে আরেকটি শাখা আটপাড়ায় মগড়ায় মিলিত হয়েছে।
চতুর্থ প্রধান নদী · সকলের গন্তব্য
ধনু নদী
মেঘালয়ের যাদুকাটা ও ধোমালিয়া নদী একত্রিত হয়ে ধনু নদীর মূল প্রবাহের সৃষ্টি। বাংলাদেশের তাহিরপুরে সোমেশ্বরী এসে ধনুতে পড়েছে। এ নদীটি মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী হয়ে কিশোরগঞ্জে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নদীটির প্রথমাংশ ধনু, মধ্যভাগ বৌলাই এবং শেষাংশ ঘোরাউৎরা নামে মেঘনায় পতিত হয়। নেত্রকোনা জেলার প্রায় সব নদীই এ নদীতে পতিত হয়ে ভাটিতে গেছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী
আরও উল্লেখযোগ্য নদীসমূহ
১৯৮৮ সালের পাহাড়ি ঢলে সোমেশ্বরী থেকে সৃষ্ট শাখা নদী। কিছুদূর গিয়ে আবার সোমেশ্বরীর মূলধারায় মিলিত হয়েছে। ২০১৪ সালের বন্যার পর আত্রাখালি থেকে নয়া গাঙ নামে আরেকটি ধারার সৃষ্টি হয়েছে।
ধলাই নদী থেকে উৎপত্তি। প্রায় ছয় কিলোমিটার উত্তরে প্রবাহিত হয়ে পূর্ব দিকে ঘুরে ধলামূলগাঁও ইউনিয়নের পাশ দিয়ে সাইদিঘা বিল থেকে পানি সংগ্রহ করে জামধলা বাজারের কাছে কংস নদীতে পতিত হয়েছে।
মেঘালয়ের পশ্চিম ও দক্ষিণ গারো পাহাড় থেকে শিববাড়ীর পাশ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ধোবাউড়া সদর হয়ে দুর্গাপুরের শঙ্করপুরের কাছে কংস নদীতে মিলিত হয়েছে — ফলে কংসের প্রবাহ অনেকটা বেড়ে গেছে।
নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। গুগবাজার হয়ে মগড়া ও পাটকুড়ার সঙ্গে মিলিত স্রোতে কেন্দুয়ার গুগবাজারের কাছে যুক্ত হয়েছে।
উত্তর ধলীরকান্দার জলাভূমি থেকে উৎপত্তি। পূর্বধলা হয়ে মগড়ায় মিলিত। মগড়ার উপরিভাগ ধলাই নামেই পরিচিত।
সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার নদী। খালিয়াজুরীতে প্রবাহিত। সর্পিলাকার প্রকৃতির।
নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার নদী। মদন উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।
নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলার নদী। সর্পিলাকার প্রকৃতির।
চিনাই নামেও পরিচিত। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার নদী।
সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার নদী।
বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃসীমান্ত নদী। নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলায় প্রবাহিত।
কেন্দুয়া ও কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় অবস্থিত।
ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার নদী। সর্পিলাকার প্রকৃতির।
নেত্রকোনা জেলার একটি সর্পিলাকার নদী।
বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃসীমান্ত নদী। নেত্রকোনা জেলায় প্রবাহিত।
কাকুড়িয়া নদী থেকে উৎপত্তি। পূর্বধলার পশ্চিমে ধলাই নদীতে পতিত হয়েছে।
উপজেলা অনুযায়ী
কোন উপজেলায় কোন নদী
এক সময় যে নদীগুলোর ওপর দিয়ে পালতোলা নৌকা চলত সেসব নদীও আজ স্রোতহারা।"
সোমেশ্বরীর মূলধারা তার উৎসস্থলে প্রায় বিলুপ্ত — বর্ষা মৌসুম ছাড়া পানি প্রবাহ থাকে না। একসময়ের খরস্রোতা খানিগাঙ এখন মরাগাঙ। সোমেশ্বরীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে পানির প্রবাহ প্রায় নেই। এ জেলায় ছোট-বড় নদীর সংখ্যা প্রায় ৫৭টি — কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোর নাম অনেকেই জানেন না।
মানব সভ্যতার বিকাশ থেকে শুরু করে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীবন-জীবিকা — সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এসব নদ-নদী। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এই নদীগুলোর ইতিহাস সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।
আপনার এলাকার নদীটির নাম, বর্তমান অবস্থা এবং নামকরণের ইতিহাস শেয়ার করুন। আমরা একসঙ্গে নেত্রকোনার নদ-নদীর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করব — যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে আমাদের নদীর ইতিহাস।
আপনার নদীর গল্প লিখুন →আপনার পাঠানো তথ্য ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে প্রকাশ করা হবে।