সাহিত্য-সংস্কৃতির উর্বরভূমি নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার আঙ্গারোয়া গ্রামের আড্ডা থেকে এক ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক উদ্যোগ ‘খনার মেলা’। চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে সূর্যোদয়ের সঙ্গে শুরু হওয়া এই আয়োজন বাংলা নববর্ষের সূর্যোদয় পর্যন্ত চলে। লোকজ সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলার এই আয়োজন করে ‘মঙ্গলঘর’ নামের একটি আড্ডা।
খনা বাংলার ঐতিহ্যের এক প্রজ্ঞাময়ী নারী, যাঁর কৃষি ও আবহাওয়াবিষয়ক বচন যুগ যুগ ধরে কৃষকের জীবন ও চর্চার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাঁর বচনকে ধারণ করে মেলার স্লোগান “খনা আছে জনে জনে, খনা আছে সব জীবনে।” প্রকৃতি, ঋতু, ফসল, পরিবেশ ও মানুষের জীবন সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ আজও গ্রামীণ সমাজে প্রাসঙ্গিক।
খনার মেলার আয়োজক ও সংগঠক কফিল আহমেদ বলেন, ‘চৈতে লতা, বৈশাখে পাতা’ এ ধরনের বচনগুলোর আমাদের লোকজীবনের যে প্রভাব সেই মহীয়সী খনাকে স্মরণ ও তাঁর চিন্তাকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচিতির সেতু এ মেলা।
মেলায় দেশি-বিদেশি শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করে। মেলায় প্রদর্শিত হয় কুলা, পাইলা, ধুচনি, দাঁড়িপাল্লা, ধারি, মাটির কলস, মটকি, সানকি এবং পাটজাত বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও হস্তশিল্প। কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে দেশি বীজ বিনিময় করেন।
সেই চিরায়ত জ্ঞানকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া, কৃষিভিত্তিক জীবনদর্শনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাই খনার মেলার মূল উদ্দেশ্য।
মঙ্গলঘর পরিসরের সংগঠক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে মেলার আয়োজন করা হয়। সংস্কৃতি ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি, গবেষক, লেখক এবং শিল্পীদের অংশগ্রহণে মেলাটি হয়ে ওঠে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার বিনিময়ের জায়গা। লোকগান, কবিতা, পালাগান, খনার বচন, কৃষি ও পরিবেশবিষয়ক আলোচনা এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে মেলার আয়োজন সাজানো হয়। শ্লোক, খনার কৃষিবিষয়ক বচন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জীবন ও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়েও হয় বিশেষ আলোচনা। এর মাধ্যমে কৃষকের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও লোকজ সংস্কৃতিকে কেবল স্মরণ নয়, বরং সমকালীন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
খনার মেলা মূলত মানুষের সঙ্গে মানুষের, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এবং অতীতের জ্ঞানের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের সংযোগ স্থাপনের একটি প্রয়াস। আধুনিকতার চাপে যখন গ্রামীণ জ্ঞান ও ঐতিহ্য ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে, তখন এই আয়োজন শেকড়ের প্রতি ফিরে দেখা এবং লোকজ জ্ঞানকে ধারণ করার এক সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।
